Saturday, May 29, 2010

এক টুকরো শৈশব

কাঠপেন্সিল, রং, তুলি, কালার-প্যালেট আর ড্রইংখাতা ইশকুলব্যাগটাতে গুঁজে নিয়ে প্রতি বিষ্যুৎবার যেতাম ধনামনি স্যারের কাছে ছবি আঁকা শিখতে। ধনামনি চাকমা। নামটার সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই প্রিয় মুখটা। সেই চাকমা ধাঁচের মঙ্গোলিয়ান চেহারা, ছোটছোট চোখ, হলদেটে গালভর্তি লালচে ব্রন-খয়েরি ব্রনের দাগ, খাড়া খাড়া চুল, থ্যাবড়ানো নাক, হলদেটে ফর্সা গায়ের রঙ, সেই হাসি আর সেই আরাকানি টানে বাংলা কথা। ক্লাশ থ্রি বা ফোরে পড়ি তখন। আমার মতনই আর সবাই খাতা রঙ সবকিছু মেলে মাটিতে বসে যেতো স্যারকে ঘিরে। চারদিকে ছড়ানো ছিটানো থাকতো 2B 4B 6B পেন্সিল, প্যাস্টেক কালারের প্যাকেট, পান্ডা মার্কা জলরং, রঙের প্যালেট আরও অনেক অনেক কিছু।এখন এটা যেন আমার স্বপ্নের একটা টুকরো দৃশ্য যেন। খুব সজীব শেডের কিছু রঙ্গে রঙ্গিন একটা দৃশ্য। স্মৃতির এলবামে একটা স্টিল ফটোগ্রাফ।
কখনোই সেরকম ডানপিটে ছিলাম না আমি। স্যারকে ভালো লাগত খুব। সরল একটা মানুষ। আঁকা খারাপ হলে সরল মনেই সেটাকে খারাপ বলে ফেলতেন। মন দিয়ে স্যারের এঁকে দেয়া ছবি দেখে দেখে আঁকতাম। জলরং করতাম খুব সাবধানে। স্যার সামনে বসে রঙ করা দেখতে থাকলে আমার নার্ভাস তুলি ধরা হাত কাঁপত। দেখে হেসে ফেলত মানুষটা। সেই হাসিটা আরেকটা স্টিল ফটোগ্রাফ।
এভাবে শিখতে শিখতে হঠাৎ খেয়াল করলাম বেশ কিছু প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জুটে গেছে আমার। কয়েকটা কাঁচা হাতের জলরং-এ আঁকা ছবি বাঁধানো অবস্থায় আমাদের ছোট বাসার ড্রইংরুমে ঝুলে থাকত। গেস্টদের কাউকে কাউকে সেগুলো দেখিয়ে আব্বু আম্মু গর্ব করলে আমি লজ্জা পেতাম, কারণ আদতে ওগুলো কোন ভালো ছবিই ছিলো না। ইশকুলেও ততদিনে ড্রইং-এ ভালো মার্কস পেতে শুরু করেছি। যে কোন ছবি দেখে দেখে সেটা এঁকে ফেলার একটা সাধারণ দক্ষতা কিভাবে যেন ধনামনি স্যারের হাত ধরে পেয়ে গেলাম নিজের মাঝে।
ইশকুলের নাম ছিল হারম্যান মেইনার স্কুল ও কলেজ। বিরাট জায়গা জুড়ে লাল ইটের ইংরেজি ‘এইচ’ অক্ষরের মতন দোতলা দালান। বেশ বড় একটা সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ। একটা বাস্কেটবল গ্রাউন্ড। অডিটোরিয়াম। পিছনে ছোট ক্লাশের ছেলেমেয়েদের জন্য স্লিপার, সী-স আর দোলনা। প্রতিদিন সকাল আটটায় বসত এসেম্‌ব্লি। কোরান তেলাওয়াত-তর্জমা, জাতীয় সংগীত, প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডামের ভাষণ ইত্যাদি। সব শেষ হলে ক্লাশ অনুসারে সবার ক্লাশরুম নামের বাক্সটার দিকে লাইন ধরে রওনা হওয়া। কড়া নিয়ম-কানুন।
বিশেষ একটা দিনের কথা বলতে এত বর্ণনা। মনে আছে গরমকাল ছিল তখন। সকাল আটটার রোদেই তাই ভীষণ তেজ। লাইন ধরে এসেম্‌ব্লিতে দাঁড়িয়ে আছি। পূব্দিকে মুখ করে দাঁড়াতাম আমরা সারি বেঁধে। রোদের তেজে সামনের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। অথচ জাতীয় সংগীতের সময় আবার নিচের দিকে তাকানোর নিয়ম নেই।
পূবদিকে সোজা তাকানো যাচ্ছিল না রোদ্দুরের তেজে। ততক্ষণে সবাই সবার সাথে গলা মিলিয়ে জাতীয় সংগীত গাইছি। “ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে কী দেখেছি ...”। ঠিক সেই মুহূর্তে পোকাটা মাথায় ঢুকল। আমার কী হল আমি জানি না। অদ্ভুত একটা জেদ মাথায় চেপে বসল। মনে হতে থাকল কেন আমি সূর্যের দিকে তাকাতে পারছি না, কেন আমার চোখজোড়া রোদ্দুরের তেজ সহ্য করতে পারছি না। বারবার চেষ্টা করেও সামনের দিকে তাকাতে পারলাম না। চোখে বারবার পানি চলে আসে। বারকয়েক চেশটার পর খুব অভিমানি হয়ে উঠেছিল সেদিন আমার ছেলেমানুষী জেদটা। কেন সূর্যটার শক্তি আমার চোখের চেয়ে বেশি- অসহায়, অর্থহীন আর শিশুসুলভ কয়েক ফোঁটা চোখের পানি কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতাসে উবে যায়। অভিমানের কয়েক ফোঁটা চোখের পানি হারিয়ে যায়। ভাগ্য ভালো কেউ দেখেনি সেটা সেদিন।

(অসম্পূর্ণ। হয়তো চলবে)

গল্পের ক্রাইসিস ও ক্লাইম্যাক্স

রাশেদ
একটা গল্পের প্লট বেশ কয়েকদিন হলো মাথায় নিয়ে ঘুরছে রাশেদ। সে গল্পকার বা লেখক নয়। লেখালেখির তেমন কোনো শখ বা খেয়ালও তার আগে কখনোই ছিল না। তবে একদিন এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় একটা শপিং সেন্টারে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে প্রথমবার তার একটা গল্প লেখার ইচ্ছে হলো। অভ্যেস নেই বলে প্রথম প্রথম কাগজ কলম নিয়ে বসে তেমন একটা লাভ হয়নি; সুকুমার রায়ের আঁকা অদ্ভূতুড়ে দেখতে প্রাণীগুলোর মতন কিছু জন্তুজানোয়ার আঁকা ছাড়া। লিখতে বসে আবার কয়েকবার এটাও মনে হয়েছে যে সে তো জীবনে কখনোই লেখক হতে চায়নি। সত্যি বলতে কি জীবনে কখনোই নির্দিষ্টভাবে কোনকিছু সে হতে চেয়েছে বলেও তার মনে পড়ে না। তাই ভাবতে থাকে কেন সে লিখবে? অবশ্য বই পড়ার একটা বাতিক তার আছে। ইশকুল জীবনে মাসুদ রানা পড়ার অভ্যেসটা সিডনি শেলডন, স্টিফেন কিং, রবার্ট লুডলাম, রবিন কুক আর হালের ড্যান ব্রাউন-মানে থ্রিলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছিল। বাংলাতেও তাই শরদিন্দু, সত্যজিৎ বা হুমায়ূন আহমেদের মতন খুব জনপ্রিয় লেখকের লেখা ছাড়া পড়া হয়নি। থ্রিলার বা রোমান্টিক উপন্যাসের ছোটখাটো সংগ্রহও গড়ে উঠেছিল যেটা বন্ধু-বান্ধবের পাঠাভ্যাসের কল্যাণে বহু আগেই বিলুপ্তপ্রায়। তাই মনে হয় যে মানুষকে জানাবার মতন তেমন কোনো জ্ঞানের কথা তার নেই যে সে লিখবে। আর এমন সাদামাটা একটা জীবন তার যে লেখার মতন অভিজ্ঞতাও তার খুব একটা নেই। লেখালেখি করবে শিল্পের সাধক টাইপের লোকজন বা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ধরণের জ্ঞানী মানুষেরা। সে তো কোনো দলেই পড়ে না।

রাশেদ একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করে। বেশ ভালো অংকের বেতন পায়। ঝামেলাবিহীন জীবন। পাশ করে একদিনের জন্যেও বেকার থাকতে হয়নি। তেমন বড় কোন উচ্চাশা নেই জীবনে। দেখতে সরল হলেও বোকা নয় সে। তার প্রমাণ কাজেকর্মে এই একটি বছরের মধ্যেই অফিসে সে নিজের যথেষ্ঠ দক্ষতা দেখাতে পেরেছে।

গল্প লেখার ইচ্ছেটা হয়েছিল সেদিন সন্ধ্যেয় দুটো মানুষকে দেখে। তাদের পাশে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে। ঐ মানুষ দুজনও তার মতনই বৃষ্টির জন্য আটকা পড়েছিল। ঝলমলে বিশাল বসুন্ধরা সিটি শপিং সেন্টারের এক্সিটে দাঁড়ানো অনেকগুলো মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল তারা তিনজন। মানুষ দুজন সমবয়সীই হবে। একজোড়া যুবক-যুবতী ওরা। আটাশ-ঊনত্রিশ হবে বয়স। দুজন দুজনাতে ভীষণ মগ্ন। এমনভাবে কথা বলছিল তারা আশেপাশে যে আরও মানুষ আছে সেটা নিয়ে যেন দুজনেই তোয়াক্কা করে না। কেউ কিছু শুনলে যেন কিছু আসে যায় না তাদের। অথচ রাশেদ মোটামুটি নিশ্চিত ব্যাপারটা এমন হওয়ার কথা নয় মোটেও। কারণ ওদের এতক্ষণের আলাপ শুনে সে যেটা বুঝেছে তা হল মেয়েটা বিবাহিতা। স্বামী সম্ভবত আর্মির ক্যাপ্টেন বা মেজর গোছের কিছু একটা হবে। মেয়েটাকে ডাকা হচ্ছিল নায়লা বলে। আর যুবকটির নাম প্রতীক অথবা পথিক। নায়লা নামের মেয়েটার আহ্লাদি ধরনের উচ্চারণের জন্যে নিশ্চিত হতে পারছিল না। পরে মনে হল নামটা পথিকই হবে।

রাশেদ আগাগোড়া ভদ্রলোক ধরনের মানুষ। ছোটবেলা থেকেই। নিজের অজান্তেই সবসময় সে অতিরিক্ত ভদ্র। তাই পাশে দাঁড়ানো পরকীয়া প্রেমেমত্ত প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তরঙ্গ আলাপ আড়ি পেতে শোনার জন্যে খানিকটা গ্লানি সে অনুভব করছিল। সবচেয়ে নিপাট সাধুর মাথায়ও খানিকটা বদ খেয়াল চাপতে পারে। তাই তার অপরাধ ততটা গুরুতর বলা যায় না। তাছাড়া সময়টাও বেশ কেটে যাচ্ছিল কথার পিঠে কথার খেলা শুনতে শুনতে।

ছেলে আর মেয়েটা খুব সম্ভবত একই ইউনিভার্সিটির একই ডিপার্টমেন্ট থেকে পাশ করেছিল। প্রেমের সম্পর্কটা তাই নতুন নয়। হয়তো বিয়েও হওয়ার কথা ছিল। সম্ভবত বাস্তবতা নামের স্বেচ্ছাচারী ক্ষুদে ঈশ্বরের গোয়ার্তুমিতে বিয়েটা হয়নি। রাশেদ খানিকটা যেন কল্পনায় মেতে ওঠে অচেনা মানুষ দুজনের ফেলে আসা ঘর-বাঁধার-স্বপ্ন-গড়া-ভাঙ্গার দিনগুলো নিয়ে। হয়তো মেয়েটার বাবা-মা জোর করে অন্য লোকের সাথে বিয়েতে বাধ্য করেছিলো; হতে পারে পথিক নামের ছেলেটা তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে।

“ডিভোর্স এতো সহজ ব্যাপার না, বোকা কোথাকার।” মেয়েটা বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল। “আর তাছাড়া আর্মি অফিসারদের ইগো বোঝো? এটা ওদের ক্যারিয়ারের জন্য ভীষণ একটা নেগেটিভ। ঘরের বউ সামলাতে পারে না, এমন অফিসার সাবোর্ডিনেটদের কিভাবে সামলাবে-এই টাইপ ব্যাপার। বুঝলা?” একটু থেমে চোখমুখ শক্ত করে মেয়েটা বলে ওঠে, “ও আমাকে এতো সহজে ছাড়বে না, আমি জানি।” রাশেদের পরিপাটি ভদ্র চোরাচাহনি ততক্ষণে জরীপ করে নিয়েছে নায়লাকে। কিছু কিছু মেয়েকে দেখলেই বিজ্ঞাপনের মডেল মনে হয়। এরা পোশাকের নতুন ফ্যাশন, হেয়ারস্টাইল ইত্যাদি রাশেদের আরো অনেক অজানা ব্যাপার নিখুঁতভাবে মেনে চলে। নায়লাকে সেরকমই একজন মনে হলো। চুলে ব্রাউন রঙ করা। লম্বা এবং বলতে নেই বেশ আকর্ষণীয় ফিগার। গায়ের রঙ ফর্সা আর শ্যামলার মাঝামাঝি। মোটকথা, হতভাগা আর্মি পার্সনটির বউখানা একজন অতি সুন্দরী যুবতী; ‘যৌনাবেদনময়ী’ শব্দটা চট করে মনে আসার মতন।

পথিক নামের যুবকটি সেই তুলনায় এক্কেবারে সাদামাটা। মাঝারি উচ্চতা। বিশেষত্বহীন চেহারা। তবে বেশ পরিপাটি। নায়লার কথা শুনে পথিকের চোয়াল শক্ত হতে দেখলো রাশেদ। চেহারায় রাগ। গজগজ করে বলল, “তো এখন আমরা কী করব? কলেজ পালানো ছেলেমেয়েদের মত লুকিয়ে চুরিয়ে জাঙ্কফুডের দোকানে বসে বসে প্রেমের খেলা কন্টিনিউ করব? এটাই তোমার ইচ্ছা! স্টুপিড!” একটা শব্দও রাশেদের কান এড়ালো না।

যেকোন কারণেই হোক, প্রেম জিনিসটা কখনো করা হয়ে ওঠেনি রাশেদের। সে নিজেও ভেবেছে ব্যাপারটা নিয়ে। ইউনিভার্সিটি থেকে বের হবার পর এই এক বছরের মধ্যেই ওর অনেক বন্ধুবান্ধব বিয়ে করে ফেলেছে। বিশেষ করে ক্লাশে যে ‘জুটি’গুলো ছিলো, তারা তো অনেক আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। পথেঘাটে সুন্দর দেখতে মেয়েগুলোর দিকে প্রায়ই থমকে তাকিয়ে থাকে সে। এদের কাউকে কাউকে প্রেমিকা বা বউ হিসেবে কল্পনা করার চেষ্টা করে।

অফিস থেকে ফিরে যখন বাসায় কোন কাজ থাকে না, টিভির রিমোট কন্ট্রোল টিপতে টিপতে অলস সময় কাটায় সে মাঝে মাঝে। অসংখ্য চ্যানেলে অসংখ্য নাটক আর সিরিয়াল। সেখানে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কগুলো কতরকম জটিলতার মধ্যে দিয়ে যেতে পারে সেগুলো দেখানো হয়। সেগুলো দেখে দেখে একা একা ঝামেলাবিহীন জীবন যে খারাপ নয় সেটা ভালোই বুঝতে পারে সে। নিজের খেয়ালখুশিতে চলতে পারার একটা সহজ আনন্দ আছে। সেটা হারানোর কোনো মানে হয় না। তবু মাঝে মাঝে বিপরীত রাস্তায় রিকশাতে অন্তরঙ্গভাবে বসে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেখলে অথবা কোন উৎসবে তাদের উল্লাস দেখলে তারও আফসোস হয়। একেবারে নিজের একটা মানুষের সে অভাব অনুভব করে। মানুষের জীবনে বড় ধরনের সমস্যা না থাকলে যা হয়।

ইউনিভার্সিটিতে বা কর্মক্ষেত্রে নানাভাবে মেয়েদের সংস্পর্শে আসতে হয়েছে তাকে। কিন্তু কোথাও কখনো সেভাবে কোন নির্দিষ্ট কারো প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেনি সে। বন্ধুদের অনেককে দেখেছে ‘টাইম পাসে’র জন্য যেমনতেমনভাবে পরিচিত মেয়েদের সাথে ঘোরাঘুরি করতে। এদের পরিচয়ের উৎস বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট অথবা বন্ধুর বন্ধু অথবা বন্ধুর বন্ধুর বন্ধু-এভাবে। সেরকম কোন সম্পর্কের ইচ্ছেও হয়নি তার। তবে বন্ধুদের আদিরসাত্মক গল্পগুলো শুনতে মন্দ লাগেতো না তার।

তবু ঐদিন পথিক এবং নায়লার কথোপকথন শুনে রাশেদের মাথায় নরনারীর সম্পর্ক বিষয়টাতে নতুন একটা ব্যাপার যোগ হল। পরকীয়া। নাটক গল্প উপন্যাসে অনেকবার পেয়েছে সে এই ব্যাপারটা। কিন্তু চোখের সামনে ওদের দেখে বিষয়টা মাথায় বেশ জায়গা করে নিল। বৃষ্টি কমে আসার পর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো সবাই যে যার পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। রাশেদও সিএনজি খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ততক্ষণে পথিক আর নায়লা হারিয়ে গেছে ভীড়ের মাঝে। আর রাশেদের মাথার মধ্যে রেখে গেছে একটা গল্পের প্লট আর গল্প লেখার ইচ্ছেটা।



তৌফিক
“কী হলো? এখনও রেডি হওনি তুমি!” নায়লার দেরি দেখে বিরক্ত হলো তৌফিক। “এতক্ষণে সবাই হয়তো পৌঁছে গেছেন। প্লিজ একটু তাড়াতাড়ি কর।” বলতে বলতে মেজর তৌফিক বেডরুম থেকে ব্যালকনিতে এসে একটা সিগারেট ধরায়। নায়লা মাঝে মাঝে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বুঝতে চায় না, ক্যারিয়ারের জন্য একজন সামরিক কর্মকর্তার জীবনে সময়ানুবর্তি হওয়া কতটা জরুরি। তৌফিকের মনে হয় যে নায়লা এটা ইচ্ছা করেই করে। তাকে রাগিয়ে দিয়ে মজা পায়।

নায়লা আরো সময় নেয়। ক্যান্টনমেন্টের জীবনে একজন মেজরের দায়িত্বশীল স্ত্রী হিসেবে মানিয়ে নিতে পারেনি বলে নয়। কেউ কিছু চাপিয়ে দিলে সহ্য হয় না ওর। খুব ধীরে ধীরে কানের দুলজোড়া পরে সে। বিউটি পার্লারে ঘন্টাকতক কাটিয়ে আসার পরও তাই সময় লাগে। “এই তো, আর পাঁচ মিনিট। এতো অস্থির হও কেন?” বেডরুম থেকে নায়লার কন্ঠ ভেসে আসে।

ঘনঘন সিগারেটে টান দ্যায় তৌফিক। কিছুক্ষণ পরে আধখাওয়া সিগারেটটা গুঁজে দ্যায় ব্যালকনিতে রাখা টি-টেবিলের অ্যাশট্রেতে। নায়লাকে ইচ্ছে করে সন্ধ্যে সাতটার বদলে সাড়ে ছয়টার কথা বলেছিলো সে। তাও এখন প্রায় সাতটা বাজতে চলেছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাত আবার চলে যায় সিগারেটের প্যাকেটের দিকে। লাইটার দিয়ে ঠোঁটে ঝোলানো সিগারেটটা ধরাতে যাবে, এমন সময় নায়লার গলা শোনা গেলো। “অ্যাই, এদিকে এসো তো একটু।”

কালো জর্জেটের আঁচলটা বাঁ হাতে মেলে ধরে মোহনীয় ভঙ্গিতে তৌফিকের সামনে নিজেকে মেলে ধরল নায়লা। ডানহাত কোমরে। ঠোঁটে হাসি। “কেমন লাগছে আমাকে বলো।”

তৌফিক সাজসজ্জার দিকে না তাকিয়ে সোজা নায়লার চোখের দিকে তাকায়। অস্বস্তির সাথে চোখ সরিয়েও নেয়। নিজের স্ত্রীর আত্মবিশ্বাস দেখে অবাক হয় মেজর তৌফিক। বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ নেই নায়লার চোখে।

তৌফিক জানে কাজটা অপরাধের মধ্যে পড়ে। কিন্তু সেদিন নায়লার মোবাইলের এসএমএস ইনবক্স না ঘাটলে তো এখনও সে জানতে পারত না তার স্ত্রী অনৈতিকভাবে পরপুরুষের সাথে একটা সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। তৌফিকের এখনো বিশ্বাস হয় না। আবার বিশ্বাস না করেও সে পারে না। নায়লাকে সরাসরি কিছু বলবে কিনা ভেবেছে এর মধ্যে বেশ কয়েকবার।



নায়লা
পুরুষের চোখে মুগ্ধতা দেখে দেখে ব্যাপারটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে নায়লা। আগের মতন তাই মুগ্ধ চোখগুলো তাকে শিহরিত করে না। প্রতি একশো পুরুষের একশোজনের চোখে সে নিজেকে আয়নার মতন দেখে নিতে পারে। দেখে দেখে আরো আত্মবিশ্বাস পায়। মুগ্ধতার সাথে সাথে কিছু পুরুষের চোখে যখন তীব্র কামনা জেগে উঠতে দ্যাখে, তখন এক ধরনের কৌতুক অনুভব করে সে। পুরুষগুলো এমন হ্যাংলা হয়! এই তো যেমন সেদিন পথিকের সাথে শপিং শেষে বসুন্ধরা সিটির নীচে পথিকের সাথে ঝগড়া করতে করতে হঠাৎ তার মনে হলো কেউ তাকে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। আড়চোখে তাকাতে খেয়াল করল একটা ছেলে তাকে বেশ কৌতূহল নিয়ে দেখছে। অভদ্রের মতন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে আবার পথিকের দিকেও তাকাচ্ছে। ছেলেটার বয়স পঁচিশের বেশি হবে না। সহজসরল চেহারা। পথিকের দিকেও তাকাচ্ছে মাঝে মাঝে। আড়ি পেতে ওদের কথা শুনছিল না তো? শুনুকগে। আমল দিলো না আর ছেলেটাকে। তৌফিকের সাথে পার্টিতে গেলেও সেই একই অভিব্যক্তির ছড়াছড়ি। মাঝে মাঝে ভীষণ একঘেয়ে লাগে তার।

এই যেমন আজকেও যেতে হবে একটা পার্টিতে। তৌফিকের তাড়াহুড়ো দেখেও সে আস্তে আস্তে তৈরি হয়। তার নিজের কোন তাড়া নেই। ক্যান্টনমেন্টের এসব সামাজিকতা তার ইদানিং অসহনীয় লাগে। কতগুলো শ্যভিনিস্ট তাদের ব্যক্তিত্বহীন বউগুলোকে নিয়ে সেখানে হাজির হয় আর নানাপদের সেন্স অভ হিউমার দেখাতে থাকে। ভাবীরাও এমনসব বিষয় নিয়ে গল্পে মেতে অঠে যেগুলোতে তার কোন কৌতূহল নেই।

মাঝে মাঝে মনে হয় বিয়ে করা আর আত্মা বিক্রি করা একই কথা। এই যে তার নিজের কোন ক্যারিয়ার গড়ে উঠল না, স্বেচ্ছাস্বাধীনভাবে চলাফেরাতে পদে পদে কৈফিয়ত আর কৈফিয়ত- বিয়ের জন্যই তো এই দমবন্ধ করা জ়ীবন তার।




পথিক
মোটরসাইকেলটার স্পীড ঠিকমতন উঠছে না। সাত-সকালে অফিসে যাওয়ার সময়ই বিরক্তির মুখোমুখি হলো পথিক। এমনিতেই রাতে ঘুম হয়নি ভালো। নায়লার সাথে মোবাইলে কথা শেষ হতে হতে রাত দু’টো বেজেছিল। ঘন্টাখানিক ধরে অহেতুক কথা কাটাকাটি করে ঘুম চলে গিয়েছিলো। ঘুমোবার জন্য একটা ডরমিকাম খেয়ে শুয়েছিলো। তার পরেও ঘুমানোর আগে শেষবার বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনটাতে সময় দেখেছিলো তিনটে দশ। অর্থাৎ কমসে কম সাড়ে তিনটা বেজেছে ঘুমাতে। পথিক জানে রাতে কম ঘুম হলে তার জের টানতে হয় সারাদিন। তার উপর সিডেটিভ খাওয়ার প্রভাব তো রয়েছেই। অথচ আজকে অফিসে খুব ব্যস্ত একটা দিন যাওয়ার কথা তার।

মোটরসাইকেলটা ওর একটা বিশ্বস্ত সঙ্গী। বন্ধুর মতন। কেনার পর থেকে খুব ভালো সার্ভিস দিচ্ছে। সহজে গড়বড় করে না। আজকে কী হলো কে জানে! বেশ কয়েকবার বেপরোয়া পিক্‌আপ তুলেও যখন দেখলো ঠিকমতন গতি উঠছে না, সিদ্ধান্তে পৌঁছলো ক্লাচপ্লেটে সমস্যা। বদলাতে হবে মনে হয় ক্লাচপ্লেটটা। একেবারে সার্ভিসিং-এ দেবে বলেই ঠিক করলো।

ঢিমেতালের গতিতে অফিসের দিকে যেতে যেতে গতকাল রাতে নায়লার সাথে মোবাইলে কথা কাটাকাটির কথা ভাবতে লাগলো সে। সেদিন সন্ধ্যায় ওরা দেখা করেছিলো বসুন্ধরা সিটিতে। নায়লাই শপিং-এ এসে ওকে ফোন করেছিলো। অফিস থেকে সোজা ও চলে এসেছিলো শপিং সেন্টারে। নায়লা কিছু টুকটাক কেনাকাটা করলো। একসাথে সময় কাটানোর জন্যে ঘুরতে ঘুরতে বেশ কিছু ডিভিডি কিনলো পথিক। জানে একটা মুভিও দেখার সময় পাবে না। বেরবার সময় শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টি থামবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ই আসলে গোলমালটা শুরু হয়েছিলো। ডিভোর্সের কথা তোলায় এইভাবে নায়লা প্রায় সিন-ক্রিয়েট করবে আগে ভাবেনি পথিক। নায়লার উপরে যেমন রাগ উঠলো, নিজের উপরও উঠলো। নইলে একসাথে শপিং-এর সময়টা খুব ভালো কেটেছিলো ওদের। গতরাতের ঝগড়ার কারণও ছিলো একই।

পথিক নিশ্চিত যে ডিভোর্সের ঝামেলার মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে নায়লা। অথচ এদিকে পথিক নিজে বাসায় তার বাবা-মাকে প্রায় রাজি করিয়ে ফেলেছে একটা ডিভোর্সি মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেওয়ার ব্যাপারে। কে জানে কত ঝামেলা পোহাতে হবে সামনে। ঐ ব্যাটা আর্মি মেজরও তো ঝামেলা কম করবে না। এসব ভাবতে ভাবতে অফিসে পৌঁছে গেলো পথিক।

পথিকের অফিসটা বনানিতে। বেশ নামকরা একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। ওর কাজ মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে। মোটরসাইকেল বেসমেন্টে পার্ক করে চাবির রিংটা আঙ্গুলে ঘোরাতে ঘোরাতে গ্রাউন্ড ফ্লোরের লিফটের দিকে এগোল সে। কিন্তু লিফটের সামনের লাইনে দেখা হয়ে গেলো সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার জুনায়েদ সিদ্দিকি অর্থাৎ ওর ইমিডিয়েট বসের সাথে। ভাগ্যটাকে গালাগাল করা ছাড়া আর কিছু করার নেই; কারণ জুনায়েদ ভাই তাকে দেখে ফেলেছেন।

“স্লামালেকুম, জুনায়েদ ভাই। কেমন আছেন?”
“ওয়ালাইকুম সালাম। এই তো আছি ভালোই। আমাকে খারাপ থাকতে দেখেছো কখনো? খারাপ থাকাথাকির মধ্যে আমি নেই। তুমি কেমন আছো বলো। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে তো?” কথা বেশি বলে লোকটা। এমনিতে মানুষ খারাপ না।
“জি, এইতো, ভালোই চলছে...”

তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ লাইনে দাঁড়ানো দুজন। লম্বা লাইন। হঠাৎ জুনায়েদ পিছন ফিরে পথিককে জিজ্ঞেস করে, “কী ব্যাপার, পথিক, আপনার শরীর খারাপ নাকি?”

“না তো। কেন ভাইয়া, দেখে তাই মনে হচ্ছে নাকি?”
“হুম্‌ম। শরীরের দিকে খেয়াল রাখবা, বুঝলা? এক কাজ কর, বিয়েটিয়ে করে ফেলো। গার্লফ্রেন্ড আছে না? তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলো। নাইলে দেখবা রেগুলার ঝগড়াঝাটি করে মেজাজ খারাপ করে অফিসে আসতেছো। কাজে মন বসতেছে না। হা হা হা।” জুনায়েদ তার জুনিয়রদের সাথে বেশ বন্ধুসুলভ আচরণ করার চেষ্টা করে, যেটা বেশিরভাগ সময়ই অপরপক্ষের জন্য বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। এটা নিয়ে অবশ্য তার কোন মাথাব্যাথা আছে বলে মনে হয় না। ওদের অফিস চৌদ্দ তলায়। সবকিছুরই শেষ আছে। জুনায়েদ ভাইয়ের সাথে লিফটে চৌদ্দ তলায় এসে নিজের ডেস্কে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পথিক।

কম্পিউটারটা অন করে উঠে গিয়ে এক মগ কফি বানিয়ে নিয়ে এসে কাজে বসল। বারোটার মধ্যেই একটা প্রেজেন্টেশন রেডি করতে হবে। সময় কম। রাতজাগা ক্লান্তির কিছুটা দূর হলো কফির মগে চুমুক দিয়ে। তবু কিছুটা ক্লান্তি রয়েই গেলো। প্রেজেন্টেশনের ম্যাটেরিয়ালগুলো বেশির ভাগই গতকাল ইন্টারনেট থেকে যোগাড় করে রেখেছিল বলে রক্ষা। এখন শুধু স্লাইডগুলো সাজাতে হবে। আশা করল বারোটার মিটিং-এর অনেক আগেই শেষ হয়ে যাবে কাজটা। কিছুক্ষণের মধ্যে কাজের মধ্যে ডুবে গেলো সে। প্রেজেন্টেশন্টা ভালো হওয়া খুব জরুরি। জি. এম. মার্কেটিং লোকটা পথিকের ভাষায় একটা আস্ত খাটাশ। খুব খুঁতখুঁতে। ছোটখাটো ফাঁক পেলেই হলো। এমন একটা মন্তব্য করে বসবে যা হজমও করা যাবে না আবার সহ্যও করা যাবে না। আশার কথা হলো লান্‌চ আওয়ারের অল্প সময় আগে মিটিংটা। খুব লম্বা হওয়ার কথা না।

প্রেজেন্টেশন স্লাইডগুলো এডিট করতে করতে ছোট্ট একটা তথ্যে চোখ আটকে গেলো পথিকের। তথ্যটির পাশে বুদ্ধি করে সেটার রেফারেন্স হিসাবে ওয়েবসাইটের ঠিকানা রেখেছিলো বলে নিজের উপর খুশি হয়ে উঠলো। ওয়েবসাইটটা ব্রাউজারে খুলে পড়তে শুরু করলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে নিজের অজান্তে উত্তেজনায় চেয়ারে মেরুদণ্ড সোজা করে বসলো। তারপর কিছুক্ষণ চললো বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ওড়াউড়ি। অবশেষে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটলো পথিকের। হাসিটা ঝুলে রইলো অনেকক্ষণ। কাজ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে এইমাত্র পাওয়া ইনফরমেশনগুলো সাজাতে লাগল মনে মনে। ধীরে ধীরে একটা পরিকল্পনা গড়ে তুললো। কোথাও ফাঁক নেই এমন একটা পরিকল্পনা।

আজকের মিটিংটা একটা বিশেষ ধরনের এন্টিহিস্টামিন জাতীয় অষুধের উপর। এলার্জি বা সাধারণ সর্দি-কাশিতে ব্যবহৃত হয় এমন। তথ্যগুলো সেটারই একটা উপাদান নিয়ে। এমনিতে সেটা নিরীহ। কিন্তু নিকোটিনের সাথে মিশিয়ে সেটা বেশিমাত্রায় গ্রহণ করলে মৃত্যু নিশ্চিত অর্থাৎ সহজভাবে বলতে গেলে সাধারণ সর্দি-কাশির অষুধের একটা উপাদান আর নিকোটিন একসাথে মিলে একটা কার্‌যকর নিউরোটিক বিষ। টক্সিকোলজির একটা অনলাইন জার্নালে খুব সাধারণভাবে লেখা কথাটাই চিন্তার ঝড় তুলেছে পথিকের মধ্যে। শুধু তা-ই নয়। এই বিষে মৃত্যু হলে পনেরো থেকে বিশ মিনিটের মধ্যেই মৃতদেহের রক্ত বা ফুসফুসের আলামত থেকে বিষ সনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। মৃত্যুর কারণ মনে হবে সাধারণ কার্ডিও-মাইয়প্যাথি বা সহজ বাংলায় হার্ট অ্যাটাক। ফরেন্সিক স্পেশালিস্টদের একটা ফোরামে এই ধরণের বিষ সনাক্তকরণ নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা পাওয়া গেলো যার সারমর্ম দাঁড়ালো, যে ধরণের স্পেক্‌ট্রোগ্রাফ গ্যাস অ্যানালাইজার এই শ্রেণীর বিষ মৃতদেহের নানান আলামত থেকে সনাক্ত করতে পারে, সে ধরণের প্রযুক্তি উন্নত বিশ্বের কিছু দেশের বাইরে কোথাও ব্যবহৃত হয় না বললেই চলে।

চোখেমুখে এই আবিষ্কারের আনন্দ থাকায় মিটিং-এ চমৎকার সপ্রতিভ মনে হলো পথিককে। জি. এম. মার্কেটিং-কে দেখে বোঝা গেলো ভদ্রলোক সন্তুষ্ট।

পথিকের এতোটা খুশি হওয়ার কারণ আর কিছুই নয়। মিটিং থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে প্রোডাক্ট হিসেবে ঐ বিশেষ এন্টিহিস্টামিনের বাজারজাতকরণের প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি ভুল হয়নি এবং সৌভাগ্যক্রমে নায়লার স্বামী একজন স্মোকার। সকালের বিরক্তি বা মেজাজ খারাপের লেশমাত্র আর রইল না পথিকের জ্বলজ্বলে চোখজোড়ায়; একটা চমৎকার খুনের পরিকল্পনা করতে পেরে।

রাশেদ
ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটে চলাচল দিনকে দিন আরো বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। অফিসের ‘পিক অ্যান্ড ড্রপ’ সার্ভিস মিস করলে তাই যাতায়াতটা অসহনীয় হয়ে পড়ে। রাশেদের বাসা শ্যামলির শেখেরটেকে। এমনিতে শেখেরটেক থেকে গুলশান যাওয়াটা আগে যতটা ঝামেলার ছিল এখন ততটা নেই। অনেকরকম বাস সার্ভিস চালু হয়েছে বছরখানেক হলো। বড় বড় সিএনজি চালিত বাস। বিশাল শব্দ তুলে রাস্তায় সেগুলো শ্লথগতিতে চলে। অনেক সময় নষ্ট হয় সেগুলোতে উঠলে।

রাশেদ আজকেও অফিসের গাড়ি মিস করেছে। বাসে উঠবে না। ঘামের দুর্গন্ধ সহ্য হয় না বাসের ভীড়ে তার। একটা ট্যাক্সি পেলে ভালো হতো। কিন্তু সকালের এই সময়টাতে সেটা পাওয়া কঠিন ব্যাপার। বেশ কিছুক্ষণ শ্যামলি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকার পর ‘ধ্যাত্তেরি’ বলে স্বভাববিরোধী একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। অফিস কামাই দেয়ার সিদ্ধান্ত।

বাড়িতে ফিরে মায়ের হাজার প্রশ্নের মুখোমুখি হলো। কেন অফিসে গেলো না, শরীর খারাপ নাকি, কি হয়েছে ইত্যাদি। যতই সে বুঝাতে চায় যে আজকে তার বিনা কারণেই কাজে যাওয়ার ইচ্ছা নাই, ততই মায়ের মুখে চিন্তার রেখা আরো স্পষ্ট হয়। এই বয়সের ছেলেদের নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা করতে কোন কারণ লাগে না। রাশেদ আর বেশি কিছু না বলে নিজের ঘরে এসে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। দেখলো বিছানায় আজকের নিউজপেপারটা পড়ে আছে। জামাকাপড় ছেড়ে পত্রিকাটা মেলে ধরল চোখের সামনে। খবরের কাগজে পড়ার তেমন কিছু পায় না সে। খবরের কাগজ ব্যাপারটাই তার একঘেয়ে লাগে। একদিনের কাগজ তার আগের দিনেরটারই কপি বলে মনে হয়। কিছুক্ষণ পেপারটা উল্টেপাল্টে বিনোদন, খেলার খবর বা ভাগ্যচক্র পড়া হয়ে গেলে পড়ার মতন আর কিছু খুঁজে পায় না সে। সেটা সরিয়ে রেখে মনে মনে ভাবতে লাগলো, অফিসে যে গেলো না, এখন সারাদিন সে কী করবে। প্রথমেই মনে হলো আজকে সেই গল্পটা লিখতে বসা যায়। বেশ সময় কেটে যাবে গল্প লেখা হোক আর না হোক।

রাশেদ কাজকর্মে বেশ মেথডিক্যাল। প্রথম প্রথম যখন লিখতে বসে কিছুই লেখা হচ্ছিল না, কিছুটা অস্থির হলেও হাল ছেড়ে দ্যায়নি। ক্রিয়েটিভ রাইটিং এর উপরে বইপত্র যোগাড় করে, ইন্টারনেট থেকে কিছু আর্টিকেল ডাউনলোড করে বেশ আয়োজন করে কিছু পড়ালেখা করে নিয়েছে। এগুলোর মধ্যে তার একটা বই বেশ ভালো লেগেছিলো। জেমস্‌ এন. ফ্রে-এর লেখা। নাম ‘How to Write a Damn Good Novel’। বইটা ভালো লাগার একটা কারণ হলো, লেখার ব্যাপারটাকে সেখানে খুব সহজ করে দেখানো হয়েছে। how to-ধরনের বই পড়তে এইজন্যে রাশেদের ভালো লাগে। বইগুলোতে ভনিতা থাকে না বেশি।

একেবারে আনকোরা নতুন রাইটিং প্যাডটার প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে চরিত্রগুলোর নাম লিখে ফেলে সে। পাশে চরিত্রের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা।

১। পথিক- গল্পের প্রধান চরিত্র। সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার অভাবে প্রেমিকার সাথে বিয়ে হয়নি। দীর্ঘদিন পর পুরনো প্রেমিকার সাথে যোগাযোগ। নায়লাকে পাওয়ার জন্য বেপরোয়া।
২। নায়লা- পরিবারের চাপাচাপিতে অন্য পুরুষের সাথে বিয়ে যা সে মেনে নিতে পারেনি। দীর্ঘদিন পর পুরনো প্রেমিকের সাথে যোগাযোগ। মানসিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। একদিকে পথিকের জন্য মমতা আর অন্যদিকে সমাজ।
৩। নায়লার স্বামী-(নামটা এখনো ঠিক করা হয়নি। সাজ্জাদ নামটা কেমন? মেজর সাজ্জাদ।)- সামরিক কর্মকর্তা। অত্যন্ত ভালো মানুষ। বুদ্ধিমান ও হৃদয়বান পুরুষ।

এইটুকু লেখার পর রাশেদ বড় বড় করে লিখল,

প্লটঃ পথিক ও নায়লার পরকীয়া প্রেম

কলমের পিছন দিকটা মুখে গুঁজে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ে রাশেদ। এখন গল্পে একটা ক্রাইসিস লাগবে। একটা সমস্যা তৈরি করতে হবে চরিত্রগুলোকে ঘিরে। একটা ক্লাইম্যাক্সে নিয়ে আসতে হবে সেগুলোকে। ক্রাইসিসটা কিভাবে তৈরি করা যায় ভাবছে। হঠাৎ করে মনে হলো খুব পুরনো একটা বিষয় নিয়ে আসলে লেখার পরিকল্পনা করছে সে। লিখতে বসার সময়কার প্রাথমিক উৎসাহ ঝিমিয়ে আসে এটা ভেবে। তারমানে ঘটনাগুলোকে বেশ ব্যতিক্রমী ধরনের হওয়া লাগবে। নতুন ধরনের কিছু।

আলসেমি জাগানো দুপুরের ভ্যাপসা গরম আর লেখার কাগজকলম ছাড়িয়ে কল্পনাকে আকাশে ডানা মেলতে দিলো রাশেদ। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ভাবছে সে। শুরুটা কেমন হতে পারে? কিছুদিন আগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ছোটগল্পগুলো সম্পর্কে একজনের একটা আর্টিকেল দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে সে পড়েছিলো। মানিক নাকি মনে করতেন ছোটগল্পগুলোর এক ধরনের ফরম্যাট হতে পারে এরকম যে, সেটা হবে কোন একটা মানুষের দশ থেকে পনেরো মিনিটের চিন্তার বর্ণনা। এই চিন্তার বর্ণনার মাঝে ফুটে উঠবে ঐ মানুষটাকে ঘিরে একটা ঘটনা। কিন্তু রাশেদ কোন ধরনের মানসিক পরিক্রমার কথা লিখতে চাচ্ছে না। সে চাচ্ছে এমনধরনের একটা গল্প লিখতে ব্যক্তিগতভাবে যে ধরনের লেখা সে নিজে পছন্দ করে। অর্থাৎ ছোটগল্প হলে তাতে থাকতে হবে অপ্রত্যাশিত কোন পরিসমাপ্তি। যাতে পাঠকের মনে একটা দাগ রেখে যেতে পারে গল্পটা।
রাশেদ
একটা গল্পের প্লট বেশ কয়েকদিন হলো মাথায় নিয়ে ঘুরছে রাশেদ। সে গল্পকার বা লেখক নয়। লেখালেখির তেমন কোনো শখ বা খেয়ালও তার আগে কখনোই ছিল না। তবে একদিন এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় একটা শপিং সেন্টারে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে প্রথমবার তার একটা গল্প লেখার ইচ্ছে হলো। অভ্যেস নেই বলে প্রথম প্রথম কাগজ কলম নিয়ে বসে তেমন একটা লাভ হয়নি; সুকুমার রায়ের আঁকা অদ্ভূতুড়ে দেখতে প্রাণীগুলোর মতন কিছু জন্তুজানোয়ার আঁকা ছাড়া। লিখতে বসে আবার কয়েকবার এটাও মনে হয়েছে যে সে তো জীবনে কখনোই লেখক হতে চায়নি। সত্যি বলতে কি জীবনে কখনোই নির্দিষ্টভাবে কোনকিছু সে হতে চেয়েছে বলেও তার মনে পড়ে না। তাই ভাবতে থাকে কেন সে লিখবে? অবশ্য বই পড়ার একটা বাতিক তার আছে। ইশকুল জীবনে মাসুদ রানা পড়ার অভ্যেসটা সিডনি শেলডন, স্টিফেন কিং, রবার্ট লুডলাম, রবিন কুক আর হালের ড্যান ব্রাউন-মানে থ্রিলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছিল। বাংলাতেও তাই শরদিন্দু, সত্যজিৎ বা হুমায়ূন আহমেদের মতন খুব জনপ্রিয় লেখকের লেখা ছাড়া পড়া হয়নি। থ্রিলার বা রোমান্টিক উপন্যাসের ছোটখাটো সংগ্রহও গড়ে উঠেছিল যেটা বন্ধু-বান্ধবের পাঠাভ্যাসের কল্যাণে বহু আগেই বিলুপ্তপ্রায়। তাই মনে হয় যে মানুষকে জানাবার মতন তেমন কোনো জ্ঞানের কথা তার নেই যে সে লিখবে। আর এমন সাদামাটা একটা জীবন তার যে লেখার মতন অভিজ্ঞতাও তার খুব একটা নেই। লেখালেখি করবে শিল্পের সাধক টাইপের লোকজন বা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ধরণের জ্ঞানী মানুষেরা। সে তো কোনো দলেই পড়ে না।

রাশেদ একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করে। বেশ ভালো অংকের বেতন পায়। ঝামেলাবিহীন জীবন। পাশ করে একদিনের জন্যেও বেকার থাকতে হয়নি। তেমন বড় কোন উচ্চাশা নেই জীবনে। দেখতে সরল হলেও বোকা নয় সে। তার প্রমাণ কাজেকর্মে এই একটি বছরের মধ্যেই অফিসে সে নিজের যথেষ্ঠ দক্ষতা দেখাতে পেরেছে।

গল্প লেখার ইচ্ছেটা হয়েছিল সেদিন সন্ধ্যেয় দুটো মানুষকে দেখে। তাদের পাশে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে। ঐ মানুষ দুজনও তার মতনই বৃষ্টির জন্য আটকা পড়েছিল। ঝলমলে বিশাল বসুন্ধরা সিটি শপিং সেন্টারের এক্সিটে দাঁড়ানো অনেকগুলো মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল তারা তিনজন। মানুষ দুজন সমবয়সীই হবে। একজোড়া যুবক-যুবতী ওরা। আটাশ-ঊনত্রিশ হবে বয়স। দুজন দুজনাতে ভীষণ মগ্ন। এমনভাবে কথা বলছিল তারা আশেপাশে যে আরও মানুষ আছে সেটা নিয়ে যেন দুজনেই তোয়াক্কা করে না। কেউ কিছু শুনলে যেন কিছু আসে যায় না তাদের। অথচ রাশেদ মোটামুটি নিশ্চিত ব্যাপারটা এমন হওয়ার কথা নয় মোটেও। কারণ ওদের এতক্ষণের আলাপ শুনে সে যেটা বুঝেছে তা হল মেয়েটা বিবাহিতা। স্বামী সম্ভবত আর্মির ক্যাপ্টেন বা মেজর গোছের কিছু একটা হবে। মেয়েটাকে ডাকা হচ্ছিল নায়লা বলে। আর যুবকটির নাম প্রতীক অথবা পথিক। নায়লা নামের মেয়েটার আহ্লাদি ধরনের উচ্চারণের জন্যে নিশ্চিত হতে পারছিল না। পরে মনে হল নামটা পথিকই হবে।

রাশেদ আগাগোড়া ভদ্রলোক ধরনের মানুষ। ছোটবেলা থেকেই। নিজের অজান্তেই সবসময় সে অতিরিক্ত ভদ্র। তাই পাশে দাঁড়ানো পরকীয়া প্রেমেমত্ত প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তরঙ্গ আলাপ আড়ি পেতে শোনার জন্যে খানিকটা গ্লানি সে অনুভব করছিল। সবচেয়ে নিপাট সাধুর মাথায়ও খানিকটা বদ খেয়াল চাপতে পারে। তাই তার অপরাধ ততটা গুরুতর বলা যায় না। তাছাড়া সময়টাও বেশ কেটে যাচ্ছিল কথার পিঠে কথার খেলা শুনতে শুনতে।

ছেলে আর মেয়েটা খুব সম্ভবত একই ইউনিভার্সিটির একই ডিপার্টমেন্ট থেকে পাশ করেছিল। প্রেমের সম্পর্কটা তাই নতুন নয়। হয়তো বিয়েও হওয়ার কথা ছিল। সম্ভবত বাস্তবতা নামের স্বেচ্ছাচারী ক্ষুদে ঈশ্বরের গোয়ার্তুমিতে বিয়েটা হয়নি। রাশেদ খানিকটা যেন কল্পনায় মেতে ওঠে অচেনা মানুষ দুজনের ফেলে আসা ঘর-বাঁধার-স্বপ্ন-গড়া-ভাঙ্গার দিনগুলো নিয়ে। হয়তো মেয়েটার বাবা-মা জোর করে অন্য লোকের সাথে বিয়েতে বাধ্য করেছিলো; হতে পারে পথিক নামের ছেলেটা তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে।

“ডিভোর্স এতো সহজ ব্যাপার না, বোকা কোথাকার।” মেয়েটা বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল। “আর তাছাড়া আর্মি অফিসারদের ইগো বোঝো? এটা ওদের ক্যারিয়ারের জন্য ভীষণ একটা নেগেটিভ। ঘরের বউ সামলাতে পারে না, এমন অফিসার সাবোর্ডিনেটদের কিভাবে সামলাবে-এই টাইপ ব্যাপার। বুঝলা?” একটু থেমে চোখমুখ শক্ত করে মেয়েটা বলে ওঠে, “ও আমাকে এতো সহজে ছাড়বে না, আমি জানি।” রাশেদের পরিপাটি ভদ্র চোরাচাহনি ততক্ষণে জরীপ করে নিয়েছে নায়লাকে। কিছু কিছু মেয়েকে দেখলেই বিজ্ঞাপনের মডেল মনে হয়। এরা পোশাকের নতুন ফ্যাশন, হেয়ারস্টাইল ইত্যাদি রাশেদের আরো অনেক অজানা ব্যাপার নিখুঁতভাবে মেনে চলে। নায়লাকে সেরকমই একজন মনে হলো। চুলে ব্রাউন রঙ করা। লম্বা এবং বলতে নেই বেশ আকর্ষণীয় ফিগার। গায়ের রঙ ফর্সা আর শ্যামলার মাঝামাঝি। মোটকথা, হতভাগা আর্মি পার্সনটির বউখানা একজন অতি সুন্দরী যুবতী; ‘যৌনাবেদনময়ী’ শব্দটা চট করে মনে আসার মতন।

পথিক নামের যুবকটি সেই তুলনায় এক্কেবারে সাদামাটা। মাঝারি উচ্চতা। বিশেষত্বহীন চেহারা। তবে বেশ পরিপাটি। নায়লার কথা শুনে পথিকের চোয়াল শক্ত হতে দেখলো রাশেদ। চেহারায় রাগ। গজগজ করে বলল, “তো এখন আমরা কী করব? কলেজ পালানো ছেলেমেয়েদের মত লুকিয়ে চুরিয়ে জাঙ্কফুডের দোকানে বসে বসে প্রেমের খেলা কন্টিনিউ করব? এটাই তোমার ইচ্ছা! স্টুপিড!” একটা শব্দও রাশেদের কান এড়ালো না।

যেকোন কারণেই হোক, প্রেম জিনিসটা কখনো করা হয়ে ওঠেনি রাশেদের। সে নিজেও ভেবেছে ব্যাপারটা নিয়ে। ইউনিভার্সিটি থেকে বের হবার পর এই এক বছরের মধ্যেই ওর অনেক বন্ধুবান্ধব বিয়ে করে ফেলেছে। বিশেষ করে ক্লাশে যে ‘জুটি’গুলো ছিলো, তারা তো অনেক আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। পথেঘাটে সুন্দর দেখতে মেয়েগুলোর দিকে প্রায়ই থমকে তাকিয়ে থাকে সে। এদের কাউকে কাউকে প্রেমিকা বা বউ হিসেবে কল্পনা করার চেষ্টা করে।

অফিস থেকে ফিরে যখন বাসায় কোন কাজ থাকে না, টিভির রিমোট কন্ট্রোল টিপতে টিপতে অলস সময় কাটায় সে মাঝে মাঝে। অসংখ্য চ্যানেলে অসংখ্য নাটক আর সিরিয়াল। সেখানে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কগুলো কতরকম জটিলতার মধ্যে দিয়ে যেতে পারে সেগুলো দেখানো হয়। সেগুলো দেখে দেখে একা একা ঝামেলাবিহীন জীবন যে খারাপ নয় সেটা ভালোই বুঝতে পারে সে। নিজের খেয়ালখুশিতে চলতে পারার একটা সহজ আনন্দ আছে। সেটা হারানোর কোনো মানে হয় না। তবু মাঝে মাঝে বিপরীত রাস্তায় রিকশাতে অন্তরঙ্গভাবে বসে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেখলে অথবা কোন উৎসবে তাদের উল্লাস দেখলে তারও আফসোস হয়। একেবারে নিজের একটা মানুষের সে অভাব অনুভব করে। মানুষের জীবনে বড় ধরনের সমস্যা না থাকলে যা হয়।

ইউনিভার্সিটিতে বা কর্মক্ষেত্রে নানাভাবে মেয়েদের সংস্পর্শে আসতে হয়েছে তাকে। কিন্তু কোথাও কখনো সেভাবে কোন নির্দিষ্ট কারো প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেনি সে। বন্ধুদের অনেককে দেখেছে ‘টাইম পাসে’র জন্য যেমনতেমনভাবে পরিচিত মেয়েদের সাথে ঘোরাঘুরি করতে। এদের পরিচয়ের উৎস বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট অথবা বন্ধুর বন্ধু অথবা বন্ধুর বন্ধুর বন্ধু-এভাবে। সেরকম কোন সম্পর্কের ইচ্ছেও হয়নি তার। তবে বন্ধুদের আদিরসাত্মক গল্পগুলো শুনতে মন্দ লাগেতো না তার।

তবু ঐদিন পথিক এবং নায়লার কথোপকথন শুনে রাশেদের মাথায় নরনারীর সম্পর্ক বিষয়টাতে নতুন একটা ব্যাপার যোগ হল। পরকীয়া। নাটক গল্প উপন্যাসে অনেকবার পেয়েছে সে এই ব্যাপারটা। কিন্তু চোখের সামনে ওদের দেখে বিষয়টা মাথায় বেশ জায়গা করে নিল। বৃষ্টি কমে আসার পর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো সবাই যে যার পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। রাশেদও সিএনজি খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ততক্ষণে পথিক আর নায়লা হারিয়ে গেছে ভীড়ের মাঝে। আর রাশেদের মাথার মধ্যে রেখে গেছে একটা গল্পের প্লট আর গল্প লেখার ইচ্ছেটা।



তৌফিক
“কী হলো? এখনও রেডি হওনি তুমি!” নায়লার দেরি দেখে বিরক্ত হলো তৌফিক। “এতক্ষণে সবাই হয়তো পৌঁছে গেছেন। প্লিজ একটু তাড়াতাড়ি কর।” বলতে বলতে মেজর তৌফিক বেডরুম থেকে ব্যালকনিতে এসে একটা সিগারেট ধরায়। নায়লা মাঝে মাঝে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বুঝতে চায় না, ক্যারিয়ারের জন্য একজন সামরিক কর্মকর্তার জীবনে সময়ানুবর্তি হওয়া কতটা জরুরি। তৌফিকের মনে হয় যে নায়লা এটা ইচ্ছা করেই করে। তাকে রাগিয়ে দিয়ে মজা পায়।

নায়লা আরো সময় নেয়। ক্যান্টনমেন্টের জীবনে একজন মেজরের দায়িত্বশীল স্ত্রী হিসেবে মানিয়ে নিতে পারেনি বলে নয়। কেউ কিছু চাপিয়ে দিলে সহ্য হয় না ওর। খুব ধীরে ধীরে কানের দুলজোড়া পরে সে। বিউটি পার্লারে ঘন্টাকতক কাটিয়ে আসার পরও তাই সময় লাগে। “এই তো, আর পাঁচ মিনিট। এতো অস্থির হও কেন?” বেডরুম থেকে নায়লার কন্ঠ ভেসে আসে।

ঘনঘন সিগারেটে টান দ্যায় তৌফিক। কিছুক্ষণ পরে আধখাওয়া সিগারেটটা গুঁজে দ্যায় ব্যালকনিতে রাখা টি-টেবিলের অ্যাশট্রেতে। নায়লাকে ইচ্ছে করে সন্ধ্যে সাতটার বদলে সাড়ে ছয়টার কথা বলেছিলো সে। তাও এখন প্রায় সাতটা বাজতে চলেছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাত আবার চলে যায় সিগারেটের প্যাকেটের দিকে। লাইটার দিয়ে ঠোঁটে ঝোলানো সিগারেটটা ধরাতে যাবে, এমন সময় নায়লার গলা শোনা গেলো। “অ্যাই, এদিকে এসো তো একটু।”

কালো জর্জেটের আঁচলটা বাঁ হাতে মেলে ধরে মোহনীয় ভঙ্গিতে তৌফিকের সামনে নিজেকে মেলে ধরল নায়লা। ডানহাত কোমরে। ঠোঁটে হাসি। “কেমন লাগছে আমাকে বলো।”

তৌফিক সাজসজ্জার দিকে না তাকিয়ে সোজা নায়লার চোখের দিকে তাকায়। অস্বস্তির সাথে চোখ সরিয়েও নেয়। নিজের স্ত্রীর আত্মবিশ্বাস দেখে অবাক হয় মেজর তৌফিক। বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ নেই নায়লার চোখে।

তৌফিক জানে কাজটা অপরাধের মধ্যে পড়ে। কিন্তু সেদিন নায়লার মোবাইলের এসএমএস ইনবক্স না ঘাটলে তো এখনও সে জানতে পারত না তার স্ত্রী অনৈতিকভাবে পরপুরুষের সাথে একটা সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। তৌফিকের এখনো বিশ্বাস হয় না। আবার বিশ্বাস না করেও সে পারে না। নায়লাকে সরাসরি কিছু বলবে কিনা ভেবেছে এর মধ্যে বেশ কয়েকবার।



নায়লা
পুরুষের চোখে মুগ্ধতা দেখে দেখে ব্যাপারটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে নায়লা। আগের মতন তাই মুগ্ধ চোখগুলো তাকে শিহরিত করে না। প্রতি একশো পুরুষের একশোজনের চোখে সে নিজেকে আয়নার মতন দেখে নিতে পারে। দেখে দেখে আরো আত্মবিশ্বাস পায়। মুগ্ধতার সাথে সাথে কিছু পুরুষের চোখে যখন তীব্র কামনা জেগে উঠতে দ্যাখে, তখন এক ধরনের কৌতুক অনুভব করে সে। পুরুষগুলো এমন হ্যাংলা হয়! এই তো যেমন সেদিন পথিকের সাথে শপিং শেষে বসুন্ধরা সিটির নীচে পথিকের সাথে ঝগড়া করতে করতে হঠাৎ তার মনে হলো কেউ তাকে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। আড়চোখে তাকাতে খেয়াল করল একটা ছেলে তাকে বেশ কৌতূহল নিয়ে দেখছে। অভদ্রের মতন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে আবার পথিকের দিকেও তাকাচ্ছে। ছেলেটার বয়স পঁচিশের বেশি হবে না। সহজসরল চেহারা। পথিকের দিকেও তাকাচ্ছে মাঝে মাঝে। আড়ি পেতে ওদের কথা শুনছিল না তো? শুনুকগে। আমল দিলো না আর ছেলেটাকে। তৌফিকের সাথে পার্টিতে গেলেও সেই একই অভিব্যক্তির ছড়াছড়ি। মাঝে মাঝে ভীষণ একঘেয়ে লাগে তার।

এই যেমন আজকেও যেতে হবে একটা পার্টিতে। তৌফিকের তাড়াহুড়ো দেখেও সে আস্তে আস্তে তৈরি হয়। তার নিজের কোন তাড়া নেই। ক্যান্টনমেন্টের এসব সামাজিকতা তার ইদানিং অসহনীয় লাগে। কতগুলো শ্যভিনিস্ট তাদের ব্যক্তিত্বহীন বউগুলোকে নিয়ে সেখানে হাজির হয় আর নানাপদের সেন্স অভ হিউমার দেখাতে থাকে। ভাবীরাও এমনসব বিষয় নিয়ে গল্পে মেতে অঠে যেগুলোতে তার কোন কৌতূহল নেই।

মাঝে মাঝে মনে হয় বিয়ে করা আর আত্মা বিক্রি করা একই কথা। এই যে তার নিজের কোন ক্যারিয়ার গড়ে উঠল না, স্বেচ্ছাস্বাধীনভাবে চলাফেরাতে পদে পদে কৈফিয়ত আর কৈফিয়ত- বিয়ের জন্যই তো এই দমবন্ধ করা জ়ীবন তার।




পথিক
মোটরসাইকেলটার স্পীড ঠিকমতন উঠছে না। সাত-সকালে অফিসে যাওয়ার সময়ই বিরক্তির মুখোমুখি হলো পথিক। এমনিতেই রাতে ঘুম হয়নি ভালো। নায়লার সাথে মোবাইলে কথা শেষ হতে হতে রাত দু’টো বেজেছিল। ঘন্টাখানিক ধরে অহেতুক কথা কাটাকাটি করে ঘুম চলে গিয়েছিলো। ঘুমোবার জন্য একটা ডরমিকাম খেয়ে শুয়েছিলো। তার পরেও ঘুমানোর আগে শেষবার বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনটাতে সময় দেখেছিলো তিনটে দশ। অর্থাৎ কমসে কম সাড়ে তিনটা বেজেছে ঘুমাতে। পথিক জানে রাতে কম ঘুম হলে তার জের টানতে হয় সারাদিন। তার উপর সিডেটিভ খাওয়ার প্রভাব তো রয়েছেই। অথচ আজকে অফিসে খুব ব্যস্ত একটা দিন যাওয়ার কথা তার।

মোটরসাইকেলটা ওর একটা বিশ্বস্ত সঙ্গী। বন্ধুর মতন। কেনার পর থেকে খুব ভালো সার্ভিস দিচ্ছে। সহজে গড়বড় করে না। আজকে কী হলো কে জানে! বেশ কয়েকবার বেপরোয়া পিক্‌আপ তুলেও যখন দেখলো ঠিকমতন গতি উঠছে না, সিদ্ধান্তে পৌঁছলো ক্লাচপ্লেটে সমস্যা। বদলাতে হবে মনে হয় ক্লাচপ্লেটটা। একেবারে সার্ভিসিং-এ দেবে বলেই ঠিক করলো।

ঢিমেতালের গতিতে অফিসের দিকে যেতে যেতে গতকাল রাতে নায়লার সাথে মোবাইলে কথা কাটাকাটির কথা ভাবতে লাগলো সে। সেদিন সন্ধ্যায় ওরা দেখা করেছিলো বসুন্ধরা সিটিতে। নায়লাই শপিং-এ এসে ওকে ফোন করেছিলো। অফিস থেকে সোজা ও চলে এসেছিলো শপিং সেন্টারে। নায়লা কিছু টুকটাক কেনাকাটা করলো। একসাথে সময় কাটানোর জন্যে ঘুরতে ঘুরতে বেশ কিছু ডিভিডি কিনলো পথিক। জানে একটা মুভিও দেখার সময় পাবে না। বেরবার সময় শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টি থামবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ই আসলে গোলমালটা শুরু হয়েছিলো। ডিভোর্সের কথা তোলায় এইভাবে নায়লা প্রায় সিন-ক্রিয়েট করবে আগে ভাবেনি পথিক। নায়লার উপরে যেমন রাগ উঠলো, নিজের উপরও উঠলো। নইলে একসাথে শপিং-এর সময়টা খুব ভালো কেটেছিলো ওদের। গতরাতের ঝগড়ার কারণও ছিলো একই।

পথিক নিশ্চিত যে ডিভোর্সের ঝামেলার মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে নায়লা। অথচ এদিকে পথিক নিজে বাসায় তার বাবা-মাকে প্রায় রাজি করিয়ে ফেলেছে একটা ডিভোর্সি মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেওয়ার ব্যাপারে। কে জানে কত ঝামেলা পোহাতে হবে সামনে। ঐ ব্যাটা আর্মি মেজরও তো ঝামেলা কম করবে না। এসব ভাবতে ভাবতে অফিসে পৌঁছে গেলো পথিক।

পথিকের অফিসটা বনানিতে। বেশ নামকরা একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। ওর কাজ মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে। মোটরসাইকেল বেসমেন্টে পার্ক করে চাবির রিংটা আঙ্গুলে ঘোরাতে ঘোরাতে গ্রাউন্ড ফ্লোরের লিফটের দিকে এগোল সে। কিন্তু লিফটের সামনের লাইনে দেখা হয়ে গেলো সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার জুনায়েদ সিদ্দিকি অর্থাৎ ওর ইমিডিয়েট বসের সাথে। ভাগ্যটাকে গালাগাল করা ছাড়া আর কিছু করার নেই; কারণ জুনায়েদ ভাই তাকে দেখে ফেলেছেন।

“স্লামালেকুম, জুনায়েদ ভাই। কেমন আছেন?”
“ওয়ালাইকুম সালাম। এই তো আছি ভালোই। আমাকে খারাপ থাকতে দেখেছো কখনো? খারাপ থাকাথাকির মধ্যে আমি নেই। তুমি কেমন আছো বলো। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে তো?” কথা বেশি বলে লোকটা। এমনিতে মানুষ খারাপ না।
“জি, এইতো, ভালোই চলছে...”

তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ লাইনে দাঁড়ানো দুজন। লম্বা লাইন। হঠাৎ জুনায়েদ পিছন ফিরে পথিককে জিজ্ঞেস করে, “কী ব্যাপার, পথিক, আপনার শরীর খারাপ নাকি?”

“না তো। কেন ভাইয়া, দেখে তাই মনে হচ্ছে নাকি?”
“হুম্‌ম। শরীরের দিকে খেয়াল রাখবা, বুঝলা? এক কাজ কর, বিয়েটিয়ে করে ফেলো। গার্লফ্রেন্ড আছে না? তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলো। নাইলে দেখবা রেগুলার ঝগড়াঝাটি করে মেজাজ খারাপ করে অফিসে আসতেছো। কাজে মন বসতেছে না। হা হা হা।” জুনায়েদ তার জুনিয়রদের সাথে বেশ বন্ধুসুলভ আচরণ করার চেষ্টা করে, যেটা বেশিরভাগ সময়ই অপরপক্ষের জন্য বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। এটা নিয়ে অবশ্য তার কোন মাথাব্যাথা আছে বলে মনে হয় না। ওদের অফিস চৌদ্দ তলায়। সবকিছুরই শেষ আছে। জুনায়েদ ভাইয়ের সাথে লিফটে চৌদ্দ তলায় এসে নিজের ডেস্কে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পথিক।

কম্পিউটারটা অন করে উঠে গিয়ে এক মগ কফি বানিয়ে নিয়ে এসে কাজে বসল। বারোটার মধ্যেই একটা প্রেজেন্টেশন রেডি করতে হবে। সময় কম। রাতজাগা ক্লান্তির কিছুটা দূর হলো কফির মগে চুমুক দিয়ে। তবু কিছুটা ক্লান্তি রয়েই গেলো। প্রেজেন্টেশনের ম্যাটেরিয়ালগুলো বেশির ভাগই গতকাল ইন্টারনেট থেকে যোগাড় করে রেখেছিল বলে রক্ষা। এখন শুধু স্লাইডগুলো সাজাতে হবে। আশা করল বারোটার মিটিং-এর অনেক আগেই শেষ হয়ে যাবে কাজটা। কিছুক্ষণের মধ্যে কাজের মধ্যে ডুবে গেলো সে। প্রেজেন্টেশন্টা ভালো হওয়া খুব জরুরি। জি. এম. মার্কেটিং লোকটা পথিকের ভাষায় একটা আস্ত খাটাশ। খুব খুঁতখুঁতে। ছোটখাটো ফাঁক পেলেই হলো। এমন একটা মন্তব্য করে বসবে যা হজমও করা যাবে না আবার সহ্যও করা যাবে না। আশার কথা হলো লান্‌চ আওয়ারের অল্প সময় আগে মিটিংটা। খুব লম্বা হওয়ার কথা না।

প্রেজেন্টেশন স্লাইডগুলো এডিট করতে করতে ছোট্ট একটা তথ্যে চোখ আটকে গেলো পথিকের। তথ্যটির পাশে বুদ্ধি করে সেটার রেফারেন্স হিসাবে ওয়েবসাইটের ঠিকানা রেখেছিলো বলে নিজের উপর খুশি হয়ে উঠলো। ওয়েবসাইটটা ব্রাউজারে খুলে পড়তে শুরু করলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে নিজের অজান্তে উত্তেজনায় চেয়ারে মেরুদণ্ড সোজা করে বসলো। তারপর কিছুক্ষণ চললো বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ওড়াউড়ি। অবশেষে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটলো পথিকের। হাসিটা ঝুলে রইলো অনেকক্ষণ। কাজ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে এইমাত্র পাওয়া ইনফরমেশনগুলো সাজাতে লাগল মনে মনে। ধীরে ধীরে একটা পরিকল্পনা গড়ে তুললো। কোথাও ফাঁক নেই এমন একটা পরিকল্পনা।

আজকের মিটিংটা একটা বিশেষ ধরনের এন্টিহিস্টামিন জাতীয় অষুধের উপর। এলার্জি বা সাধারণ সর্দি-কাশিতে ব্যবহৃত হয় এমন। তথ্যগুলো সেটারই একটা উপাদান নিয়ে। এমনিতে সেটা নিরীহ। কিন্তু নিকোটিনের সাথে মিশিয়ে সেটা বেশিমাত্রায় গ্রহণ করলে মৃত্যু নিশ্চিত অর্থাৎ সহজভাবে বলতে গেলে সাধারণ সর্দি-কাশির অষুধের একটা উপাদান আর নিকোটিন একসাথে মিলে একটা কার্‌যকর নিউরোটিক বিষ। টক্সিকোলজির একটা অনলাইন জার্নালে খুব সাধারণভাবে লেখা কথাটাই চিন্তার ঝড় তুলেছে পথিকের মধ্যে। শুধু তা-ই নয়। এই বিষে মৃত্যু হলে পনেরো থেকে বিশ মিনিটের মধ্যেই মৃতদেহের রক্ত বা ফুসফুসের আলামত থেকে বিষ সনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। মৃত্যুর কারণ মনে হবে সাধারণ কার্ডিও-মাইয়প্যাথি বা সহজ বাংলায় হার্ট অ্যাটাক। ফরেন্সিক স্পেশালিস্টদের একটা ফোরামে এই ধরণের বিষ সনাক্তকরণ নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা পাওয়া গেলো যার সারমর্ম দাঁড়ালো, যে ধরণের স্পেক্‌ট্রোগ্রাফ গ্যাস অ্যানালাইজার এই শ্রেণীর বিষ মৃতদেহের নানান আলামত থেকে সনাক্ত করতে পারে, সে ধরণের প্রযুক্তি উন্নত বিশ্বের কিছু দেশের বাইরে কোথাও ব্যবহৃত হয় না বললেই চলে।

চোখেমুখে এই আবিষ্কারের আনন্দ থাকায় মিটিং-এ চমৎকার সপ্রতিভ মনে হলো পথিককে। জি. এম. মার্কেটিং-কে দেখে বোঝা গেলো ভদ্রলোক সন্তুষ্ট।

পথিকের এতোটা খুশি হওয়ার কারণ আর কিছুই নয়। মিটিং থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে প্রোডাক্ট হিসেবে ঐ বিশেষ এন্টিহিস্টামিনের বাজারজাতকরণের প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি ভুল হয়নি এবং সৌভাগ্যক্রমে নায়লার স্বামী একজন স্মোকার। সকালের বিরক্তি বা মেজাজ খারাপের লেশমাত্র আর রইল না পথিকের জ্বলজ্বলে চোখজোড়ায়; একটা চমৎকার খুনের পরিকল্পনা করতে পেরে।

রাশেদ
ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটে চলাচল দিনকে দিন আরো বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। অফিসের ‘পিক অ্যান্ড ড্রপ’ সার্ভিস মিস করলে তাই যাতায়াতটা অসহনীয় হয়ে পড়ে। রাশেদের বাসা শ্যামলির শেখেরটেকে। এমনিতে শেখেরটেক থেকে গুলশান যাওয়াটা আগে যতটা ঝামেলার ছিল এখন ততটা নেই। অনেকরকম বাস সার্ভিস চালু হয়েছে বছরখানেক হলো। বড় বড় সিএনজি চালিত বাস। বিশাল শব্দ তুলে রাস্তায় সেগুলো শ্লথগতিতে চলে। অনেক সময় নষ্ট হয় সেগুলোতে উঠলে।

রাশেদ আজকেও অফিসের গাড়ি মিস করেছে। বাসে উঠবে না। ঘামের দুর্গন্ধ সহ্য হয় না বাসের ভীড়ে তার। একটা ট্যাক্সি পেলে ভালো হতো। কিন্তু সকালের এই সময়টাতে সেটা পাওয়া কঠিন ব্যাপার। বেশ কিছুক্ষণ শ্যামলি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকার পর ‘ধ্যাত্তেরি’ বলে স্বভাববিরোধী একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। অফিস কামাই দেয়ার সিদ্ধান্ত।

বাড়িতে ফিরে মায়ের হাজার প্রশ্নের মুখোমুখি হলো। কেন অফিসে গেলো না, শরীর খারাপ নাকি, কি হয়েছে ইত্যাদি। যতই সে বুঝাতে চায় যে আজকে তার বিনা কারণেই কাজে যাওয়ার ইচ্ছা নাই, ততই মায়ের মুখে চিন্তার রেখা আরো স্পষ্ট হয়। এই বয়সের ছেলেদের নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা করতে কোন কারণ লাগে না। রাশেদ আর বেশি কিছু না বলে নিজের ঘরে এসে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। দেখলো বিছানায় আজকের নিউজপেপারটা পড়ে আছে। জামাকাপড় ছেড়ে পত্রিকাটা মেলে ধরল চোখের সামনে। খবরের কাগজে পড়ার তেমন কিছু পায় না সে। খবরের কাগজ ব্যাপারটাই তার একঘেয়ে লাগে। একদিনের কাগজ তার আগের দিনেরটারই কপি বলে মনে হয়। কিছুক্ষণ পেপারটা উল্টেপাল্টে বিনোদন, খেলার খবর বা ভাগ্যচক্র পড়া হয়ে গেলে পড়ার মতন আর কিছু খুঁজে পায় না সে। সেটা সরিয়ে রেখে মনে মনে ভাবতে লাগলো, অফিসে যে গেলো না, এখন সারাদিন সে কী করবে। প্রথমেই মনে হলো আজকে সেই গল্পটা লিখতে বসা যায়। বেশ সময় কেটে যাবে গল্প লেখা হোক আর না হোক।

রাশেদ কাজকর্মে বেশ মেথডিক্যাল। প্রথম প্রথম যখন লিখতে বসে কিছুই লেখা হচ্ছিল না, কিছুটা অস্থির হলেও হাল ছেড়ে দ্যায়নি। ক্রিয়েটিভ রাইটিং এর উপরে বইপত্র যোগাড় করে, ইন্টারনেট থেকে কিছু আর্টিকেল ডাউনলোড করে বেশ আয়োজন করে কিছু পড়ালেখা করে নিয়েছে। এগুলোর মধ্যে তার একটা বই বেশ ভালো লেগেছিলো। জেমস্‌ এন. ফ্রে-এর লেখা। নাম ‘How to Write a Damn Good Novel’। বইটা ভালো লাগার একটা কারণ হলো, লেখার ব্যাপারটাকে সেখানে খুব সহজ করে দেখানো হয়েছে। how to-ধরনের বই পড়তে এইজন্যে রাশেদের ভালো লাগে। বইগুলোতে ভনিতা থাকে না বেশি।

একেবারে আনকোরা নতুন রাইটিং প্যাডটার প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে চরিত্রগুলোর নাম লিখে ফেলে সে। পাশে চরিত্রের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা।

১। পথিক- গল্পের প্রধান চরিত্র। সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার অভাবে প্রেমিকার সাথে বিয়ে হয়নি। দীর্ঘদিন পর পুরনো প্রেমিকার সাথে যোগাযোগ। নায়লাকে পাওয়ার জন্য বেপরোয়া।
২। নায়লা- পরিবারের চাপাচাপিতে অন্য পুরুষের সাথে বিয়ে যা সে মেনে নিতে পারেনি। দীর্ঘদিন পর পুরনো প্রেমিকের সাথে যোগাযোগ। মানসিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। একদিকে পথিকের জন্য মমতা আর অন্যদিকে সমাজ।
৩। নায়লার স্বামী-(নামটা এখনো ঠিক করা হয়নি। সাজ্জাদ নামটা কেমন? মেজর সাজ্জাদ।)- সামরিক কর্মকর্তা। অত্যন্ত ভালো মানুষ। বুদ্ধিমান ও হৃদয়বান পুরুষ।

এইটুকু লেখার পর রাশেদ বড় বড় করে লিখল,

প্লটঃ পথিক ও নায়লার পরকীয়া প্রেম

কলমের পিছন দিকটা মুখে গুঁজে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ে রাশেদ। এখন গল্পে একটা ক্রাইসিস লাগবে। একটা সমস্যা তৈরি করতে হবে চরিত্রগুলোকে ঘিরে। একটা ক্লাইম্যাক্সে নিয়ে আসতে হবে সেগুলোকে। ক্রাইসিসটা কিভাবে তৈরি করা যায় ভাবছে। হঠাৎ করে মনে হলো খুব পুরনো একটা বিষয় নিয়ে আসলে লেখার পরিকল্পনা করছে সে। লিখতে বসার সময়কার প্রাথমিক উৎসাহ ঝিমিয়ে আসে এটা ভেবে। তারমানে ঘটনাগুলোকে বেশ ব্যতিক্রমী ধরনের হওয়া লাগবে। নতুন ধরনের কিছু।

আলসেমি জাগানো দুপুরের ভ্যাপসা গরম আর লেখার কাগজকলম ছাড়িয়ে কল্পনাকে আকাশে ডানা মেলতে দিলো রাশেদ। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ভাবছে সে। শুরুটা কেমন হতে পারে? কিছুদিন আগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ছোটগল্পগুলো সম্পর্কে একজনের একটা আর্টিকেল দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে সে পড়েছিলো। মানিক নাকি মনে করতেন ছোটগল্পগুলোর এক ধরনের ফরম্যাট হতে পারে এরকম যে, সেটা হবে কোন একটা মানুষের দশ থেকে পনেরো মিনিটের চিন্তার বর্ণনা। এই চিন্তার বর্ণনার মাঝে ফুটে উঠবে ঐ মানুষটাকে ঘিরে একটা ঘটনা। কিন্তু রাশেদ কোন ধরনের মানসিক পরিক্রমার কথা লিখতে চাচ্ছে না। সে চাচ্ছে এমনধরনের একটা গল্প লিখতে ব্যক্তিগতভাবে যে ধরনের লেখা সে নিজে পছন্দ করে। অর্থাৎ ছোটগল্প হলে তাতে থাকতে হবে অপ্রত্যাশিত কোন পরিসমাপ্তি। যাতে পাঠকের মনে একটা দাগ রেখে যেতে পারে গল্পটা।

পরকীয়া প্রেমের গল্প হলে সিনেমাতে দেখানো হয় সেটার ব্যর্থতা। থ্রিলার হলে অবধারিতভাবে চলে আসে খুনখারাবি। থ্রিলারের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়েও থ্রিলার লিখতে চাচ্ছে না সে। তার গল্প হবে বাস্তবকে ঘিরে। বাস্তবের চরিত্রগুলো থ্রিলারের চরিত্রগুলোর মতন এতো সহজে নিশ্চয়ই খুনখারাবিতে জড়িয়ে পড়ে না। লেখালেখির মধ্যে কিছুতেই ‘Tradition paralysis’-এর শিকার হবে না সে। সবাই যেটাকে অবক্ষয় বলে, সে সেটাকে অবক্ষয় বলবে না। সে আরও তলিয়ে দেখবে। আরো তলিয়ে পাঠককে দেখাবে।

নায়লা আর পথিকের মধ্যে সম্পর্কের কারণে তৈরি একটা ক্রাইসিস আর ক্লাইম্যাক্স নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে দুই চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো তার সে টেরও পেলো না। ঠিক তখনই শহরের অন্য কোন প্রান্তে তার গল্পের প্রধান চরিত্র বাস্তবের পথিক একটা খুনের পরিকল্পনা করছে। নিখুঁত পরিকল্পনা।


(অসম্পূর্ণ।। হয়তো চলবে)
পরকীয়া প্রেমের গল্প হলে সিনেমাতে দেখানো হয় সেটার ব্যর্থতা। থ্রিলার হলে অবধারিতভাবে চলে আসে খুনখারাবি। থ্রিলারের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়েও থ্রিলার লিখতে চাচ্ছে না সে। তার গল্প হবে বাস্তবকে ঘিরে। বাস্তবের চরিত্রগুলো থ্রিলারের চরিত্রগুলোর মতন এতো সহজে নিশ্চয়ই খুনখারাবিতে জড়িয়ে পড়ে না। লেখালেখির মধ্যে কিছুতেই ‘Tradition paralysis’-এর শিকার হবে না সে। সবাই যেটাকে অবক্ষয় বলে, সে সেটাকে অবক্ষয় বলবে না। সে আরও তলিয়ে দেখবে। আরো তলিয়ে পাঠককে দেখাবে।

নায়লা আর পথিকের মধ্যে সম্পর্কের কারণে তৈরি একটা ক্রাইসিস আর ক্লাইম্যাক্স নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে দুই চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো তার সে টেরও পেলো না। ঠিক তখনই শহরের অন্য কোন প্রান্তে তার গল্পের প্রধান চরিত্র বাস্তবের পথিক একটা খুনের পরিকল্পনা করছে। নিখুঁত পরিকল্পনা।

শহর মানেই গ্রামের গল্প...

বাসে জানালার ধারে বসলে মনে হয় সিনেমা দেখছি। বিশেষ ক’রে সন্ধ্যের পর জানালার ফ্রেমগুলো টিভিপর্দার মত লাগে। দিনের ব্যস্ততা আর ছুটোছুটির সাথে তখন যোগ হয় অবসাদ আর ভ্যাপসা অস্থিরতা। চারদিকে অন্যমনষ্ক মানুষের ভীড়। বাসের যাত্রীরা নিষ্প্রাণ চোখে বাইরে বা সামনে তাকিয়ে থাকে। যেন বেঁচে থাকাটা স্রেফ সহ্য করে নিয়েছে তারা। আর কিছু নয়। কারো কারো কাছে কি আমাকেও ঐরকম মনে হয়? কি জানি। সবাই ওভাবে গোমড়ামুখ হয়ে বসে কি ভাবে মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছা হয় আমার। জানার উপায় নেই। আমি তাই জানালার ফ্রেমে সিনেমা দেখতে মশগুল হই। নানারকম গাড়ির হর্ণ, চিৎকার আর কোলাহলের শব্দ ছাপিয়ে মনের মধ্যে প্রিয় কোন গান ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে বাজতে থাকে। কাজের জায়গা থেকে দিন শেষে বাড়ি ফিরতে প্রায় সোয়া এক ঘন্টা লেগে যায়। এলোমেলো নানান ভাবনায় আচ্ছন্ন থেকে বেশ কেটে যায় সময়টা।

ঢাকা শহরের প্রায় সব রুটের বাসে আমাকে চড়তে হয়। কোন বাস সার্ভিসের রুট কোথায়-কতদূর, এ বিষয়ে আমি মোটামুটি বিশেষজ্ঞ। ছোট একটা কোম্পানিতে কাজ করি। মালিকের অর্ডার-সাপ্লাইয়ের ব্যবসা। নানারকম স্যাম্পল নিয়ে ক্লায়েন্টদের কাছে প্রায়ই ছুটতে হয়। মার্কেট যাচাই করতে ঘুরতে হয় বিভিন্ন জায়গায়। প্রথম প্রথম দু’চার টাকা বাঁচাতে লোকাল মিনিবাসগুলোতে ভীড় ঠেলাঠেলি করে উঠতাম। কিন্তু ইদানিং ভীড়ের মধ্যে মানুষের ঘামের উটকো দুর্গন্ধটা আর সহ্য হয় না। তাই সিটিং সার্ভিসগুলোতে চেপে বসি। দু’চার টাকা বাঁচানোর তাড়া আর অনুভব করি না। তাছাড়া মাঝে মাঝে অল্পবয়সী সুন্দরি কোন মেয়ের পাশে বসারও সৌভাগ্য হয়। কল্পনাগুলো তখন পক্ষীরাজের পিঠে চেপে ছোটে। সেসময়গুলোতে মোবাইলে কোন কল আসলে বেশ ভারিক্কি চালে কথা বলি। আড়চোখে বারবার তাকাই। নিজের ছেলেমানুষিতে নিজেই আবার মনে মনে হাসি।

আমাদের কোম্পানিতে আমার মত আরো দু’জন আছে। একজন হল তমাল। আরেকজন বারী ভাই। তমাল আমার দু বছরের জুনিয়র; আমাদের বস্‌ অর্থাৎ রেজা ভাইয়ের মামাতো ভাই সে। বেশ বদমেজাজি ছেলে। বেশ সামলে কথা বলতে হয় তার সাথে। আর বারী ভাই সিনিয়র মানুষ। কাজেকর্মে যাচ্ছেতাই। ব্যাচেলর মানুষ। তাকে প্রায়ই আমরা তার বিয়ে নিয়ে খোচাই। উনি কিছু বলেন না। মুখ টিপে হাসেন। আর আছে অফিসের পিওন বাবুল। পাঁচজনের অফিস দু’টো ঘর নিয়ে। আর আছে কিচেন ও ছোট একটা টয়লেট। একটা ঘরে রেজা ভাই অফিসে আসলে বসেন। আরেক ঘরে আমরা তিনজন। বাবুল রাতে অফিসেই থাকে। রেজা ভাইয়ের ঘরটার এককোণে বিছানা করে ঘুমায়। রেজাভাই অফিসে খুব কম সময় থাকেন। তার নাকি আরও কি কি ব্যবসা আছে। খুব ছুটোছুটি নাকি করতে হয়। বেশিরভাগ সময় আমাদেরকে নানান ডিরেকশন দেয়া হয় মোবাইল ফোনে। অফিসে দু’টো কম্পিউটার আছে। রেজা ভাইয়েরটাতে ইন্টারনেট আছে। প্রায়ই বাইরে থেকে অফিসে ফিরে দেখি তমাল ওটাতে বসে চ্যাটিং করছে। বাইরে থেকে এসে এই দৃশ্য দেখে রাগ ওঠে। কিন্তু কিছু বলি না। করুক যার যা খুশি। বারী ভাইয়েরও কাজেকর্মে মন নেই। উনি বসে বসে খবরের কাগজে কি যেন পড়েন। মাঝে মাঝে তার ঠোঁটের কিনারায় মৃদু হাসির রেখা দেখা যায়। এই তো আজকেও তমাল বারী ভাইয়ের হাসি দেখে টিটকারি দিয়ে বলে উঠলো- “ভাই, আর কত পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন দেখবেন?” মুখের হাসিটা অল্প একটু প্রসারিত করে উনি বললেন- “পাত্রী চাই দেখি না তো। আরও কত মজার জিনিস আছে দেখার।“ তমাল আরও একধাপ নামে- “তাহলে কি গোপন রোগের চিকিৎসার অ্যাড্‌ দেখেন নাকি?” তমালের বেয়াদবি দেখে গা জ্বলে। কিছু বলি না। আলসেমি লাগে যেন। মনে হয়- কী লাভ! কুকুরের লেজ কি সোজা হয়?

বাসের জানালা দিয়ে লাল-নীল নিওনের আলো দেখতে দেখতে কি মনে হল। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে ইংরেজি হরফে একটা মেসেজ লিখলাম-“অনেকদিন খোঁজখবর নেই। ভুলে গেলেন না তো?” লিখে মুছে ফেললাম। নাহ, আপনি করে লিখব না। বয়সে বড় হলেও শেষবার তো তুমি তুমি করেই কথা হয়েছিল। আবার লিখলাম- “কেমন আছো? ভুলে গেলে নাকি?” আবার মুছলাম। ন্যাকামি করার জন্য নিজেকে ঝেড়ে দু’টো বকা দিলাম। মোবাইলটা আবার পকেটে ভরলাম। মেসেজ পাঠালাম না। মেয়েটাকে বেশি পাত্তা দেওয়া ঠিক হবে না।

শ্যাওড়াপাড়ায় একটা দুইরুমের বাসা ভাড়া করে আমি আর আমার বন্ধু মারুফ থাকি। ছয়তলায় বলে ভাড়া কিছুটা হাতের নাগালে। বাস থেকে নেমে হেঁটে অনেকটা ভিতরে যেতে হয়। তারপর ছয়তলার সিঁড়ি ভাঙ্গা। তালা খুলে বাসায় ঢুকি প্রতিদিন। মারুফ বেশ রাত করে ফেরে। একা থাকতে আমার ভালো লাগে। মারুফের সাথে থাকার সুবিধা হল ওর-ও একা থাকতে ভালো লাগে। ফলে দু’জনেই নিজের নিজের মত থাকি। ঝামেলা হয় না। মারুফ আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু যদিও নয়, তবু আমার মনে হয় ও আমাকে বেশ বুঝতে পারে।

আজকে বাসায় ফিরে দেখি মারুফ আমার আগেই এসে পড়েছে। তালা নেই। নক করতেই ও খুলে দিল। বললাম-কিরে আজকে এতো তাড়াতাড়ি? মারুফের সংক্ষিপ্ত জবাব- শরীরটা ভাল নেই। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করে জবাব পেলাম না। জানতাম পাবো না। তাই আর কিছু বললাম না। চোখে লালচে ভাব দেখে ভাবলাম জ্বর-টর হয়েছে মনে হয়। ঘরে গিয়ে কাপড় ছেড়ে গোসল করতে ঢুকলাম। বাথরুমে সিগারেটের গন্ধ। দম আটকে এলো। মারুফকে অনেক অনুরোধ করেছি বাথরুমে সিগারেট না টানতে। লাভ হয় না। বলে- সিগারেট ছাড়া নাকি তার বাথরুম ক্লিয়ার হয় না। আজব লাগে আমার। একসাথে থাকার স্বার্থে এটা আমাকে মেনে নিতে হয়।

(হয়তো চলবে)

Saturday, July 4, 2009

নোটস্‌ ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড

এক
ঘরটা ছোট। বড়জোড় দশ ফুট বাই দশ ফুট। ছোট একটা জানালা আছে। গ্রীল দেয়া। ঘরের দরজাটাও ছোট। ক্লস্ট্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত একজন মানুষের জন্য ঘরটা একটা টর্চার সেল। ছোটখাট একটা দোজখ। মন-খারাপ করা চুনকাম-খসে যাওয়া দেয়াল দিয়ে ঘেরা কফিন.। তবু প্রতিটা দিন বেলা শেষে নিজের শ্রান্ত দেহটাকে টেনেহিঁচড়ে ঘরের কোণের সাড়ে পাঁচ ফুট বাই তিন ফুট চৌকিটাতে এনে ফেলে দিতে হয় মামুনকে। তার আগে সিলিং ফ্যানের সুইচটা অন করতে হয়। টিমটিমে বাতিটা জ্বালতে হয়। ঘড়ঘড় শব্দ করতে করতে সিলিং ফ্যানটা নিতান্ত অনিচ্ছায় ঘুরতে থাকে। বাতাস হয় না তেমন। প্রায়ই ভাবে সিলিং ফ্যানের ক্যাপাসিটর বদলাতে হবে। তাহলে নাকি বাতাস বাড়বে। আরও অনেক জরুরি কাজের মতন এটাও করা হয়ে ওঠে না।
চিত হয়ে সোজা হয়ে শুলে সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা চৌকিটাতে লম্বা শরীরটা আঁটে না। পা বেরিয়ে থাকে। পাশ ফিরলে ক্যাঁচকোঁচ করে শব্দ হয়। অনেকদিন না ধোয়ায় বালিশের ওয়াড়ে একটা বিশ্রি বাজে গন্ধ। বেডশীটটারও একই দশা। ময়লা জমে জমে তাতে আঠালো একটা ভাব।
সব কিছু সহ্য হয়। শুধু এই একটা ব্যাপারই সহ্য হতে চায় না। কিছুক্ষণ ঘরের মধ্যে থাকলেই মনে হয় ঘরটা ছোট হয়ে আসছে। ঘরের ছাদ দ্রুত নিচে নেমে আসছে। চারপাশে ধীরে ধীরে আলো কমে আসছে। নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য দরকারি বাতাস কমে যাচ্ছে দ্রুত। এখনই দমবন্ধ হয়ে যাবে যেন। হাসফাঁস লাগে। ভয় হতে থাকে আরেকটু পরই হয়তো ঘরটা কবর হয়ে যাবে। ফ্যানের দিকে তাকিয়ে নিজেকে বারবার অটোসাজেশন দিতে হয়- আমি চমৎকার নিঃশ্বাস নিতে পারছি। আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে না। শরীর খারাপ লাগছে না। ঘর ছোট হয়ে আসছে না। ছাদটা নিচে নেমে আসছে না। বিড়বিড় করে কথাগুলো বলতে বলতে নিজেকে ভীষণ রকম অসহায় লাগে মামুনের। ভীষণ রকম ক্লান্ত আর অবসন্ন লাগে। নিজেকে কীট-পতঙ্গ মনে হতে থাকে। মানুষ বলে আর মনে হয় না। ঘামে চটচটে হয়ে থাকা শরীর নিয়ে নিথর শুয়ে শুয়ে বিড়বিড় করে সে আপনমনে। এটা রোজকার একটা ব্যাপার।
মামুন জানে সে আস্তে আস্তে মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছে। যখন এক্কেবারে ঘরটাকে কবর মনে হতে শুরু করে সাইকোলজির ভাষায় যাকে বলে প্যানিক এটাক, তখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সে রাস্তায়। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটাহাঁটি করে, কোথাও বা থমকে দাঁড়ায়, মানুষের চলাচল দ্যাখে আর লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নেয়। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চায় যতটা পারে। খোলা কোন মাঠে বা নদীর পাড়ের ভেজা বাতাসের মাঝে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। সময়ে সময়ে প্রায়ই তার মনে হয় বেশিদিন সে বাঁচবে না এই শহরে। এইরকম সময়গুলোতে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে এই বেঁচে থাকার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে থাকে। কত অদ্ভুত আর আজব সব ভাবনা যে আসে মনে তার কোন সীমা পরিসীমা নেই। মাঝে মাঝে এটাও মনে হয় যে মৃত্যুর জন্য এভাবে অপেক্ষায় না থেকে কাজটা নিজে নিজে সেরে ফেলাই মনে হয় বেশি লজিক্যাল। তারমানে আত্মহত্যা, যেটা কিনা আবার মহাপাপ। ছাব্বিশ বছরের কোন যুবকের জন্যে এটা অস্বাভাবিক সেটা না বললেও চলে।
সেদিনও এরকম একটা দম-আটকে-আসা সন্ধ্যায় সুইসাইড করা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ফুটপাত ধরে হাঁটছিল। ফুটপাতের ধারে ইদানিং সস্তা ধরনের মিউজিক ভিডিও, গান ইত্যাদির সিডি, ডিভিডি আর নানারকম বই (ধর্মীয় কিতাব থেকে শুরু করে পর্ণোগ্রাফিক সাহিত্য) সাজিয়ে নিয়ে হকাররা বসে। পুরনো বইও পাওয়া যায়। অলসভাবে প্রথমে চটি ঘাটতে ঘাটতে পুরনো বইগুলোর দিকে এগোল সে। হঠাৎ চোখ পড়ল “মরণের আগে ও পরে” বইটার উপর। হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল বইটা। লেখকের নাম মাওঃ শাহ্‌ ওয়ালিউল্লাহ। মাওঃ মানে বোধহয় মাওলানা। পুরনো বই। সেকেন্ড-হ্যান্ড। মলাটের খানিকটা ছেঁড়া। মৃত্যুচিন্তা হচ্ছিল আর সস্তায় পাওয়া গেল বলেই মনে হয় বইটা কিনে ফেলল সে। দাম নিল চল্লিশ টাকা। বইয়ের পাতা উল্টপাল্টে দেখা গেলো বেশ কাব্যিক ভাষায় মানুষের জন্ম-মৃত্যু-পরিণতি-কবরের আজাব-হাশর-বেহেস্ত-দোজখ ইত্যাকার বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করা হয়েছে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট কবিতাও লেখা। বই পড়ার অভ্যাস একেবারেই নেই তার। তবে আত্মহত্যাপ্রবণ একজন মানুষ হিসাবে “মরণের আগে ও পরে” পড়া যেতে পারে। জানা দরকার কী আছে ওপারে মানে মৃত্যুর পরে। মাওঃ শাহ ওয়ালিউল্লাহ কী বলেছেন দেখা যাক।
“কী আছে ওপারে”-কথাটা মনে হতেই সে বুঝতে পারল ওপার ব্যাপারটা সে আসলে মন থেকে বিশ্বাস করে। মানে ইহকাল-পরকাল এই দুটো আলাদা জগতের সমান্তরাল অবস্থান আর তাদের বিভাজনে তার বিশ্বাস আছে। সেকেন্ড-হ্যান্ড “মরণের আগে ও পরে” বইটা হাতে নিয়ে ফুটপাতের ভীড়ে মিশে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জটিল সব দার্শনিক চিন্তা ভর করতে শুরু করল তার মাথায়। এই যে বেঁচে থাকা, দুঃখ-কষ্টের অনুভূতি, হতাশা- এই যে কোন কিছু ছোঁয়া, জিভে খাবারের স্বাদ, শরীরে ব্যথার অনুভূতি এগুলো মৃত্যুর পর থাকবে কিভাবে? দেহ আর ইন্দ্রিয় তো কবরের মাটিতে মিশে যাবে। তাহলে কবরের আজাবের অনুভূতি কিভাবে পাবে মানুষ? এরকম হাজারো চিন্তা ভর করে মামুনের মাথায়।
সন্ধ্যের এই সময়টায় মানুষ তাড়াহুড়া করে ঘরে ফেরে। অফিস থেকে, কাজ থেকে কিংবা অকাজ থেকে। কোথায় যেন ও পড়েছিল-“Home is the place where when you have to get back, they have to take you in.” কার কথা মনে নেই। সে নিজে তো উলটো ঘর থেকে পালায়। একটা দীর্ধশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে তার। মিশে যায় শহরের গরম ডিজেল আর পেট্রোল পোড়া বাতাসে।
বইটা এখনো পড়ে আছে তার নোংরা বালিশটার পাশে। পড়া হয়ে ওঠেনি। আসলে সেদিন কেনার সময় যেমন পড়ার আগ্রহ হয়েছিল, সেরকম আগ্রহও আর হয়নি।
মামুনের একটা মোবাইল ফোন আছে। সস্তা ধরনের। যে চাকরি সে করে তার সাথে মানানসই। খুব কমই ব্যবহৃত হয় যন্ত্রটা। আসলে ওর পরিচিত মানুষের গণ্ডি খুবই সীমিত। তবে একটা মেয়ের সাথে প্রায় রাতেই গল্প হয় ওর। এসএমএস-ও আদান-প্রদান চলে। তবে সেটার হারও খুব বেশি নয়। মেয়েটার নাম সিনথি। সিনথির সাথে সেই গল্প করার সময়টুকুতে মামুন সুইসাইডের কথা ভুলে যায়। সিনথি যদি সত্যি কথা বলে থাকে ওকে, তাহলে ধরে নিতে হবে মেয়েটা ওরই মত সুইসাইড নিয়ে ভাবছে অথচ সাহস পাচ্ছে না। মেয়েটার সাথে কথার খেলা খেলতে খেলতে ঘুমে যখন চোখ জড়িয়ে আসে তখন ফোন কেটে যায়। আর যেদিন এই কথার খেলা জমে না, দুজনেই বলার মতন কিছু খুঁজে পায় না, সেদিন ক্লস্ট্রোফোবিয়ায় পেয়ে বসে তাকে, সাফোকেশন শুরু হয়, রাত নির্ঘুম হয়ে যায়। ইনসমনিয়া বুকে চেপে বসে। টেবিলের ড্রয়ারে বেশ অনেকরকম ঘুমের অষুধ থাকে সব সময়। মিডাজোলাম থেকে শুরু করে ব্রোমাজিপাম-সব। সেই নির্ঘুম রাতগুলোতে ছ’সাতটা নানাপদের ট্যাবলেট গিলে ঘুমের অপেক্ষায় শুয়ে থাকে সে।
খাঠের ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ, টিকটিকিদের ডাকাডাকি, দূরে রাস্তায় রিকশার টুংটাং শব্দ করে চলে যাওয়া, নিঃস্তব্ধ রাতের ঝিঝি আওয়াজ- এসবের দিকে মনোযোগ দিয়ে সাফোকেশন থেকে বাঁচতে চায় সে কিংবা সিনথির কথা ভাবতে থাকে অথবা ছুটির দিনে বসুন্ধরা সিটি বা রাইফেলস স্কয়ার এর সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা মেয়েগুলোর শরীরের ভিতর আর বাইরেটা নিয়ে ভাবতে থাকে। শারীরিক উত্তেজনা দিয়ে দম আটকানো ভাবটা চাপা দিতে চায়। ওসব ভাবতে ভাবতে কোন কোন দিন ঘুম এসে যায়। কোন কোন দিন আসে না। স্লিপিং পিলের প্রভাবে হালকা ঝিম ধরা একটা অনুভূতি নিয়ে রাত পার হয় সেই নির্ঘুম রাতগুলোতে। বলা বাহুল্য ঠিক একই রকম একটা নতুন দিন আসে। সকালবেলার সূর্যোদয় নাকি অনেকের খুব ভালো লাগে। হয়তো তারা প্রতিদিন দেখতে পায় না বলে। মামুনের কাছে সূর্য ওঠা কোন আনন্দ বয়ে আনে না। আরেকটা ক্লান্তিকর চূড়ান্ত ডিপ্রেসিভ দিনের শুরুটা কোন বিশেষ আনন্দ বয়ে আনার কথা নয় কারো জন্যেই।
আজকেও অমন একটা নির্ঘুম রাত গেছে। গরমকালে তাড়াতাড়ি সকাল হয়। খুব তাড়াতাড়ি চারদিক উজ্জ্বল চোখ-ধাঁধানো আলোয় ভরে ওঠে। ছোট গ্রীল দেয়া জানালাটা দিয়ে আসা এক চিলতে রোদ্দুরেই ছোট ঘরটা ঝকঝকে আলোয় জ্বলজ্বল করে। মামুনের চোখে জ্বালা ধরায় ওই আলো। ছ’টা বাজে। অফিসে রওনা হবে সাড়ে আটটায়। দু’ঘন্টা সময় কাটাতে বালিশের পাশের “মরণের আগে ও পরে” হাতে তুলে নেয় সে। উর্দ্দু শব্দের মুহুর্মুহু ব্যবহার বিরক্তি ধরিয়ে দিল পাঁচ মিনিটেই।
(to be continued)