Saturday, July 4, 2009
নোটস্ ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড
ঘরটা ছোট। বড়জোড় দশ ফুট বাই দশ ফুট। ছোট একটা জানালা আছে। গ্রীল দেয়া। ঘরের দরজাটাও ছোট। ক্লস্ট্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত একজন মানুষের জন্য ঘরটা একটা টর্চার সেল। ছোটখাট একটা দোজখ। মন-খারাপ করা চুনকাম-খসে যাওয়া দেয়াল দিয়ে ঘেরা কফিন.। তবু প্রতিটা দিন বেলা শেষে নিজের শ্রান্ত দেহটাকে টেনেহিঁচড়ে ঘরের কোণের সাড়ে পাঁচ ফুট বাই তিন ফুট চৌকিটাতে এনে ফেলে দিতে হয় মামুনকে। তার আগে সিলিং ফ্যানের সুইচটা অন করতে হয়। টিমটিমে বাতিটা জ্বালতে হয়। ঘড়ঘড় শব্দ করতে করতে সিলিং ফ্যানটা নিতান্ত অনিচ্ছায় ঘুরতে থাকে। বাতাস হয় না তেমন। প্রায়ই ভাবে সিলিং ফ্যানের ক্যাপাসিটর বদলাতে হবে। তাহলে নাকি বাতাস বাড়বে। আরও অনেক জরুরি কাজের মতন এটাও করা হয়ে ওঠে না।
চিত হয়ে সোজা হয়ে শুলে সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা চৌকিটাতে লম্বা শরীরটা আঁটে না। পা বেরিয়ে থাকে। পাশ ফিরলে ক্যাঁচকোঁচ করে শব্দ হয়। অনেকদিন না ধোয়ায় বালিশের ওয়াড়ে একটা বিশ্রি বাজে গন্ধ। বেডশীটটারও একই দশা। ময়লা জমে জমে তাতে আঠালো একটা ভাব।
সব কিছু সহ্য হয়। শুধু এই একটা ব্যাপারই সহ্য হতে চায় না। কিছুক্ষণ ঘরের মধ্যে থাকলেই মনে হয় ঘরটা ছোট হয়ে আসছে। ঘরের ছাদ দ্রুত নিচে নেমে আসছে। চারপাশে ধীরে ধীরে আলো কমে আসছে। নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য দরকারি বাতাস কমে যাচ্ছে দ্রুত। এখনই দমবন্ধ হয়ে যাবে যেন। হাসফাঁস লাগে। ভয় হতে থাকে আরেকটু পরই হয়তো ঘরটা কবর হয়ে যাবে। ফ্যানের দিকে তাকিয়ে নিজেকে বারবার অটোসাজেশন দিতে হয়- আমি চমৎকার নিঃশ্বাস নিতে পারছি। আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে না। শরীর খারাপ লাগছে না। ঘর ছোট হয়ে আসছে না। ছাদটা নিচে নেমে আসছে না। বিড়বিড় করে কথাগুলো বলতে বলতে নিজেকে ভীষণ রকম অসহায় লাগে মামুনের। ভীষণ রকম ক্লান্ত আর অবসন্ন লাগে। নিজেকে কীট-পতঙ্গ মনে হতে থাকে। মানুষ বলে আর মনে হয় না। ঘামে চটচটে হয়ে থাকা শরীর নিয়ে নিথর শুয়ে শুয়ে বিড়বিড় করে সে আপনমনে। এটা রোজকার একটা ব্যাপার।
মামুন জানে সে আস্তে আস্তে মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছে। যখন এক্কেবারে ঘরটাকে কবর মনে হতে শুরু করে সাইকোলজির ভাষায় যাকে বলে প্যানিক এটাক, তখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সে রাস্তায়। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটাহাঁটি করে, কোথাও বা থমকে দাঁড়ায়, মানুষের চলাচল দ্যাখে আর লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নেয়। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চায় যতটা পারে। খোলা কোন মাঠে বা নদীর পাড়ের ভেজা বাতাসের মাঝে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। সময়ে সময়ে প্রায়ই তার মনে হয় বেশিদিন সে বাঁচবে না এই শহরে। এইরকম সময়গুলোতে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে এই বেঁচে থাকার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে থাকে। কত অদ্ভুত আর আজব সব ভাবনা যে আসে মনে তার কোন সীমা পরিসীমা নেই। মাঝে মাঝে এটাও মনে হয় যে মৃত্যুর জন্য এভাবে অপেক্ষায় না থেকে কাজটা নিজে নিজে সেরে ফেলাই মনে হয় বেশি লজিক্যাল। তারমানে আত্মহত্যা, যেটা কিনা আবার মহাপাপ। ছাব্বিশ বছরের কোন যুবকের জন্যে এটা অস্বাভাবিক সেটা না বললেও চলে।
সেদিনও এরকম একটা দম-আটকে-আসা সন্ধ্যায় সুইসাইড করা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ফুটপাত ধরে হাঁটছিল। ফুটপাতের ধারে ইদানিং সস্তা ধরনের মিউজিক ভিডিও, গান ইত্যাদির সিডি, ডিভিডি আর নানারকম বই (ধর্মীয় কিতাব থেকে শুরু করে পর্ণোগ্রাফিক সাহিত্য) সাজিয়ে নিয়ে হকাররা বসে। পুরনো বইও পাওয়া যায়। অলসভাবে প্রথমে চটি ঘাটতে ঘাটতে পুরনো বইগুলোর দিকে এগোল সে। হঠাৎ চোখ পড়ল “মরণের আগে ও পরে” বইটার উপর। হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল বইটা। লেখকের নাম মাওঃ শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ। মাওঃ মানে বোধহয় মাওলানা। পুরনো বই। সেকেন্ড-হ্যান্ড। মলাটের খানিকটা ছেঁড়া। মৃত্যুচিন্তা হচ্ছিল আর সস্তায় পাওয়া গেল বলেই মনে হয় বইটা কিনে ফেলল সে। দাম নিল চল্লিশ টাকা। বইয়ের পাতা উল্টপাল্টে দেখা গেলো বেশ কাব্যিক ভাষায় মানুষের জন্ম-মৃত্যু-পরিণতি-কবরের আজাব-হাশর-বেহেস্ত-দোজখ ইত্যাকার বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করা হয়েছে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট কবিতাও লেখা। বই পড়ার অভ্যাস একেবারেই নেই তার। তবে আত্মহত্যাপ্রবণ একজন মানুষ হিসাবে “মরণের আগে ও পরে” পড়া যেতে পারে। জানা দরকার কী আছে ওপারে মানে মৃত্যুর পরে। মাওঃ শাহ ওয়ালিউল্লাহ কী বলেছেন দেখা যাক।
“কী আছে ওপারে”-কথাটা মনে হতেই সে বুঝতে পারল ওপার ব্যাপারটা সে আসলে মন থেকে বিশ্বাস করে। মানে ইহকাল-পরকাল এই দুটো আলাদা জগতের সমান্তরাল অবস্থান আর তাদের বিভাজনে তার বিশ্বাস আছে। সেকেন্ড-হ্যান্ড “মরণের আগে ও পরে” বইটা হাতে নিয়ে ফুটপাতের ভীড়ে মিশে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জটিল সব দার্শনিক চিন্তা ভর করতে শুরু করল তার মাথায়। এই যে বেঁচে থাকা, দুঃখ-কষ্টের অনুভূতি, হতাশা- এই যে কোন কিছু ছোঁয়া, জিভে খাবারের স্বাদ, শরীরে ব্যথার অনুভূতি এগুলো মৃত্যুর পর থাকবে কিভাবে? দেহ আর ইন্দ্রিয় তো কবরের মাটিতে মিশে যাবে। তাহলে কবরের আজাবের অনুভূতি কিভাবে পাবে মানুষ? এরকম হাজারো চিন্তা ভর করে মামুনের মাথায়।
সন্ধ্যের এই সময়টায় মানুষ তাড়াহুড়া করে ঘরে ফেরে। অফিস থেকে, কাজ থেকে কিংবা অকাজ থেকে। কোথায় যেন ও পড়েছিল-“Home is the place where when you have to get back, they have to take you in.” কার কথা মনে নেই। সে নিজে তো উলটো ঘর থেকে পালায়। একটা দীর্ধশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে তার। মিশে যায় শহরের গরম ডিজেল আর পেট্রোল পোড়া বাতাসে।
বইটা এখনো পড়ে আছে তার নোংরা বালিশটার পাশে। পড়া হয়ে ওঠেনি। আসলে সেদিন কেনার সময় যেমন পড়ার আগ্রহ হয়েছিল, সেরকম আগ্রহও আর হয়নি।
মামুনের একটা মোবাইল ফোন আছে। সস্তা ধরনের। যে চাকরি সে করে তার সাথে মানানসই। খুব কমই ব্যবহৃত হয় যন্ত্রটা। আসলে ওর পরিচিত মানুষের গণ্ডি খুবই সীমিত। তবে একটা মেয়ের সাথে প্রায় রাতেই গল্প হয় ওর। এসএমএস-ও আদান-প্রদান চলে। তবে সেটার হারও খুব বেশি নয়। মেয়েটার নাম সিনথি। সিনথির সাথে সেই গল্প করার সময়টুকুতে মামুন সুইসাইডের কথা ভুলে যায়। সিনথি যদি সত্যি কথা বলে থাকে ওকে, তাহলে ধরে নিতে হবে মেয়েটা ওরই মত সুইসাইড নিয়ে ভাবছে অথচ সাহস পাচ্ছে না। মেয়েটার সাথে কথার খেলা খেলতে খেলতে ঘুমে যখন চোখ জড়িয়ে আসে তখন ফোন কেটে যায়। আর যেদিন এই কথার খেলা জমে না, দুজনেই বলার মতন কিছু খুঁজে পায় না, সেদিন ক্লস্ট্রোফোবিয়ায় পেয়ে বসে তাকে, সাফোকেশন শুরু হয়, রাত নির্ঘুম হয়ে যায়। ইনসমনিয়া বুকে চেপে বসে। টেবিলের ড্রয়ারে বেশ অনেকরকম ঘুমের অষুধ থাকে সব সময়। মিডাজোলাম থেকে শুরু করে ব্রোমাজিপাম-সব। সেই নির্ঘুম রাতগুলোতে ছ’সাতটা নানাপদের ট্যাবলেট গিলে ঘুমের অপেক্ষায় শুয়ে থাকে সে।
খাঠের ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ, টিকটিকিদের ডাকাডাকি, দূরে রাস্তায় রিকশার টুংটাং শব্দ করে চলে যাওয়া, নিঃস্তব্ধ রাতের ঝিঝি আওয়াজ- এসবের দিকে মনোযোগ দিয়ে সাফোকেশন থেকে বাঁচতে চায় সে কিংবা সিনথির কথা ভাবতে থাকে অথবা ছুটির দিনে বসুন্ধরা সিটি বা রাইফেলস স্কয়ার এর সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা মেয়েগুলোর শরীরের ভিতর আর বাইরেটা নিয়ে ভাবতে থাকে। শারীরিক উত্তেজনা দিয়ে দম আটকানো ভাবটা চাপা দিতে চায়। ওসব ভাবতে ভাবতে কোন কোন দিন ঘুম এসে যায়। কোন কোন দিন আসে না। স্লিপিং পিলের প্রভাবে হালকা ঝিম ধরা একটা অনুভূতি নিয়ে রাত পার হয় সেই নির্ঘুম রাতগুলোতে। বলা বাহুল্য ঠিক একই রকম একটা নতুন দিন আসে। সকালবেলার সূর্যোদয় নাকি অনেকের খুব ভালো লাগে। হয়তো তারা প্রতিদিন দেখতে পায় না বলে। মামুনের কাছে সূর্য ওঠা কোন আনন্দ বয়ে আনে না। আরেকটা ক্লান্তিকর চূড়ান্ত ডিপ্রেসিভ দিনের শুরুটা কোন বিশেষ আনন্দ বয়ে আনার কথা নয় কারো জন্যেই।
আজকেও অমন একটা নির্ঘুম রাত গেছে। গরমকালে তাড়াতাড়ি সকাল হয়। খুব তাড়াতাড়ি চারদিক উজ্জ্বল চোখ-ধাঁধানো আলোয় ভরে ওঠে। ছোট গ্রীল দেয়া জানালাটা দিয়ে আসা এক চিলতে রোদ্দুরেই ছোট ঘরটা ঝকঝকে আলোয় জ্বলজ্বল করে। মামুনের চোখে জ্বালা ধরায় ওই আলো। ছ’টা বাজে। অফিসে রওনা হবে সাড়ে আটটায়। দু’ঘন্টা সময় কাটাতে বালিশের পাশের “মরণের আগে ও পরে” হাতে তুলে নেয় সে। উর্দ্দু শব্দের মুহুর্মুহু ব্যবহার বিরক্তি ধরিয়ে দিল পাঁচ মিনিটেই।
(to be continued)
Tuesday, June 2, 2009
স্বাদ
স্বাদ
আহসানুল কারিম
রচনাকালঃ মে ২০০৯
(আমি বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি বিভাগে একজন ফরেন্সিক সাইক্রিয়াটিস্ট হিসাবে কর্মরত ছিলাম বিগত পঁচিশ বছর যাবত। সম্প্রতি অবসরগ্রহণ করেছি। এখানে বলে নেয়া দরকার একজন ফরেন্সিক সাইক্রিয়াটিস্ট হিসাবে আমার দায়িত্ব কী ছিল। ফরেন্সিক সাইক্রিয়াটিস্ট হিসাবে আসামিদের মানসিক অবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে তদন্ত করতে হত। প্রয়োজনে আদালতে স্বাক্ষ্য দিতে হত। তদন্ত ও আদালতে স্বাক্ষ্য দিতে প্রায়ই ঢাকার বাইরে যেতে হত। তবে শুনে যতটা রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছে ততটা ছিলো না আমার কাজ। কাজ বেশিরভাগই ছিল একঘেয়ে ধরনের। তাই বলে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি কম হতে হয়নি এই পঁচিশ বছরের কর্মজীবনে। অপরাধীদের মনের অন্ধকার অলিসন্ধিতে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাদের দেয়া জবানবন্দির বিভিন্ন সোর্স থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। ক্রমাগত বিশ্লেষণ করতে হয়েছে তাদের আচরণ আর তাদের অপরাধপ্রবণতার পিছনে দায়ী মনস্তত্ত্বের।মানুষের মন যে কত অদ্ভুত অনিয়ম ধরে চলে তার প্রমাণ আমি পেয়েছি পদে পদে। মূলত কর্মজীবনে পাওয়া এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখালেখি করে অবসরজীবনটা পার করে দেব বলে ভেবেছি। কেসস্টাডি ধরনের কাঠখোট্টা-টাইপ লেখা নয়। কিছুটা গল্পের আমেজ দিয়ে ঘটনাগুলো তুলে ধরতে চাই। বর্তমান গল্পটি আমার কর্মজীবনের স্মৃতি থেকে লেখা। আসামির জবানবন্দির যতটুকু এই বুড়ো মানুষটার স্মৃতিতে আছে তারই ফসল এই গল্প। এই ঘটনাটি সেসময় পত্রপত্রিকায় দারুণ আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু দৈনিক সংবাদপত্রে ঘটনার অন্তরালের বহু কিছু তো আসেই না, বরং অহেতুক রঙ চড়ানো হয় পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য। এই গল্পে যথোপযুক্ত কারণেই চরিত্রগুলোর নাম বদলে দেয়া হচ্ছে। কারণ আসামি সেই সময়কার একজন স্বনামধন্য লেখিকা এবং যাঁকে তিনি খুন করেছিলেন তিনি ছিলেন একজন্ প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক। লেখিকা ছিলেন তার স্বামীহত্যার দায়ে অভিযুক্ত। মূল গল্পে চলে যাওয়ার আগে আরেকটা ব্যাপার পরিষ্কার করে নেওয়া ভাল। আসামির জবানবন্দির ঠিক যতটুকু মনে আছে, আমি ঠিক ততটুকুই লিখব। হয়ত খুঁটিনাটি অনেককিছু বাদ পড়ে যাবে। সেজন্য পাঠকের কাছে নিবেদন এই যে বুড়ো মানুষটাকে তার স্মৃতির সীমাবদ্ধতার জন্য ক্ষমা করতে হবে। আমি আমার কর্মজীবনে বহু খুন-খারাবির কেসে কাজ করেছি। এই ঘটনাটি ছিলো নৃশংসতম ঘটনাগুলোর একটি। আসামির মানসিক ভারসাম্য কতটুকু ছিল সে বিষয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিলাম আমি। মামলার ফলাফল হয়েছিল মহিলার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কারাগারে থাকাকালে আসামি জেসমিন রাহমান তিথি(কাল্পনিক নাম) আত্মহত্যা করেন।)
খোদার কসম খেয়ে বলছি, আমি এখন যা যা বলব তার প্রতিটা কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। আপনি যদি কোরান শরীফ ছুঁয়ে শপথ করতে বলেন তো আমি রাজি আছি। আমি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও সুস্থ মস্তিষ্কে কথা বলছি। তবে মানসিকভাবে সামান্য অস্থির আমি। সেকারণে আমার কথাগুলো এলোমেলো লাগতে পারে। মনে হতে পারে পাগলের প্রলাপ। কিন্তু আমি যা বলব তার প্রতিটা কথা সত্যি। শুধু বলতে চাই আমি পাগল বা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত নই।
আমি যা করেছি তার জন্য আমার কোন অনুতাপ নেই। আমি বরং গর্বিত। নিজের মেধা আর সাহসের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছি আমি পদে পদে। ভয়াবহ মানসিক দ্বন্দ্ব ও চাপের মুখোমুখি হয়েও ভেঙ্গে পড়িনি। সাহসের সাথে প্রতিটা সিদ্ধান্ত নিজে নিজে নিয়েছি। বিয়াল্লিশ বছর বয়সের একজন নারী হিসাবে আমি আপনাকে অত্যন্ত গর্বের সাথে জানাতে চাই যে, আমার হাজবেন্ড প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক তানভির হাসানকে নিজ হাতে হত্যা করেছি।
কেন আর কিভাবে কাজটা করলাম সেটা বলব এখন।
বিশ বছর আগে তানভির হাসানের সাথে পরিচয় হয় আমার। আমি তখন জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী। ওর ডিপার্টমেন্ট ছিল নাট্যতত্ত্ব। তার মত আমিও ড্রামা ক্লাবের সদস্য ছিলাম। আসলে নাটক-ফাটক কিছু না। আড্ডাবাজি করতাম গিয়ে সবাই মিলে।
তখনো তানভিরকে চিনি না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার এক দশকপূর্তি উপলক্ষে ড্রামাক্লাব একটা নাটক মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নিল। ডিরেকশনে ছিলো তানভির; সবার প্রিয় তানভির ভাই। ওই নাটকে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে আমাকে বাধ্য হয়ে অভিনয় করতে হল। সবার উৎসাহে মাত্র দুই সপ্তাহ সময়ের মধ্যে নাটকটা দাঁড়িয়ে গেল। মঞ্চস্থ হওয়ার পর বেশ প্রশংসিতও হল সেটা। কিন্তু নাটকের সেই দুই সপ্তাহ শেষে যেটা আবিষ্কার করলাম তা হল ঝাঁকড়া এলোমেলো চুলের মোটা কালো ফ্রেমের চশমা পরা নাটকের ডিরেক্টরটিকে আমি মিস করছি। আসলে এতো মাতিয়ে রেখেছিল ওই দিনগুলোতে সবাইকে ও...। প্রথমে ব্যাপারটাকে আমল দিলাম না। কিন্তু মানুষের মনের ভিতরে তার অনিচ্ছায় বা অগোচরে নানান খেলা চলে। তার উপরে মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সেই খেলাতে মাতাল আমি হঠাৎ একদিন নিজেকে খুঁজে পেলাম ডিপার্টমেন্টের করিডোরে দাঁড়িয়ে গল্প করছি তানভিরের সাথে। বলতে পারব না সেদিন কি হয়েছিল আমার। আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের নিয়তিকে দেখে ফেললাম। একটা সম্পর্কের সূত্রপাত হল।
এতো সুন্দর ছিল আমাদের ক্যাম্পাসটা! গাছগাছালিতে ঘেরা আর পাখির ডাকে মুখর ক্যাম্পাস আরো সুন্দর হয়ে উঠেছিল আমাদের সেই শান্ত অলস দুপুরগুলোতে দু’জনের গাঢ় সান্নিধ্যে। আমরা কথা বলতাম, কথা হারাতাম, কথায় হারাতাম নিজেদেরকে, স্বচ্ছ ঝিলের পানিতে পাশাপাশি একে অপরের চোখের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে শব্দহীন ভাষায় কথা বলতাম। আর কোনফাঁকে দুপুরগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে বিকেল হত। সন্ধ্যা নামলে ফিরতাম হলে।
সম্পর্ক-প্রকৃতি-ভাললাগা-ভালবাসায় স্বপ্নময় তিনটে বছর পার হওয়ার পর বিয়ে হল আমাদের। তখনো তানভির তেমন প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠেনি। ছোটখাট একটা বিজ্ঞাপনি সংস্থায় কাজ করে। বন্ধুর ব্যবসা। আয়-রোজগার নিয়মিত নয়। বিয়েটা আমাদের দুই পরিবারের অমতের হয়েছিল ব’লে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম দু’টো পরিবার থেকেই। একটা সময়ে আমরা বুঝতে পারলাম বাস্তবতা বলে একটা ব্যাপার আছে আর সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে আমরা দু’জন পরিকল্পনাহীন মানুষ। তবু সবকিছুর মাঝেও একটা সহজ আনন্দ ছিল। আমাদের দোলা দিয়ে যেত।
তানভির ছিল আগাগোড়া একজন সৃজনশীল মানুষ। বড় কিছু হওয়ার আর বড় করার কিছু স্বপ্ন দেখত সে সবসময়। নিজের সৃষ্টিশীলতার প্রতি অতিরিক্ত প্রত্যাশা ছিল ওর। হয়তো একারনেই একটা সময়ে হঠাৎ ভেঙ্গে পড়ল ও। খুব সহজে আমি আবিষ্কার করলাম তানভির ফেন্সিডিলে আসক্ত। নিজের স্বপ্ন আর প্রত্যাশাগুলো ও বিকিয়ে দিল নেশার কাছে। নিজেকে আমার বোঝা মনে হতে শুরু করল।
বিপদগুলো মানুষের জীবনে সবসময় একসাথে আসে। আর প্রতিকূলতা মানুষকে শেখায় শক্ত হ’তে। আমি আস্থা হারালাম না। নিজের ভালবাসার মানুষটাকে এত সহজে হেরে যেতে দেব এতটা দুর্বল তো আমি নই। হ্যাঁ, আমিই ওকে ফিরিয়ে আনলাম নেশার সেই অন্ধকার জগৎ থেকে। একটি বাক্যাংশে ব’লে ফেলা ‘অন্ধকার জগৎ থেকে ফেরানো’ যে আমার কত নির্ঘুম রাত আর হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফল তা শুধু আমিই জানি। কেউ কোনদিন সেটা বুঝবে না। আমিও সেসব ব’লে বক্তব্য অহেতুক দীর্ঘ করব না। এক কথায় নিজের নিষ্ঠা আর ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম আমি। তানভির সুস্থ হল। এদিকে আমার জীবনেও কিছু পরিবর্তন এলো। একটা নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে বাংলা সাহিত্য পড়াতে শুরু করেছি। লেখালেখির একটা পুরন্নো ইচ্ছা ছিল। অল্পবিস্তর লেখালেখি শুরু করে দিলাম।
খারাপ সময় জীবনে যেমন বিনামেঘে বজ্রপাতের মতন আসে, ভালো সময় সেভাবে আসে না। তবে সেই ভাল সময়ের আগমনের ঝিরঝিরে সুবাতাস টের পাওয়া যায়। আমাদের দুই জনের এলোমেলো সংসারটা কিভাবে যেন বেশ গোছানো হয়ে উঠতে লাগল। তানভিরও সেই আগের মতন উদ্যোমি আর হাসিখুশি হয়ে উঠল ধীরে ধীরে। প্রতিকূলতাকে মেনে নিয়ে সেই অনুযায়ী কর্মপন্থা ঠিক করে লক্ষে অবিচল থাকার ব্যাপারটা আয়ত্ব করে নিয়েছে সে ততদিনে। নিজের মেধা ও ক্ষমতার উপর বিশ্বাস এসেছে ততোদিনে আমাদের।
এদিকে আমার লেখা একটা ছোটগল্পের সংকলন বের করতে রাজি হলেন এক প্রকাশক। তানভির সে সময়টায় ব্যস্ত ছিল চাকুরি, ফিল্ম এডিটিং এর উপর কিছু ট্রেনিং আর ওয়ার্কশপ নিয়ে। বইটা সম্পর্কে ওকে কিছু জানাইনি। একটা সারপ্রাইজ হবে যখন পাবলিশ হওয়া বইটা ওর হাতে দেব। সেই মূহুর্তটার জন্য অপেক্ষায় অধীর সময় কাটতে লাগল আমার। ফেব্রুয়ারির বইমেলাতে বই বের হবে। অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকি আমি।
অপেক্ষার পালা যতই দীর্ঘ লাগুক তা শেষ হয় এক সময়। সেইদিনটার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। তানভিরকে বলেছিলাম-চল একুশের বইমেলা থেকে ঘুরে আসি। বইমেলায় ঢুকেই সোজা আমার পাবলিশারের স্টলে ওকে টেনেহিছড়ে নিয়ে গেলাম। স্টলে আমার নিজের বইটা দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না ওটা আমার নিজের লেখা। তানভিরকে ফিসফিস করে আমার বইটা দেখিয়ে বললাম-ওই বইটা কিনে দাও। প্রথমে ও বুঝতে পারেনি। বইয়ের প্রচ্ছদে আমার নামটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ যখন বুঝতে পারল ওটা আমারই লেখা, অর চোখে আমি বিস্ময়ের শ্রেষ্ঠতম প্রভা দেখলাম। ভারি চশমার ওইপাশের চোখদুটো বিস্ময়ে কী অসম্ভব ঝকঝকে আর সুন্দর লাগছিল সেটা কি ও জানত! বইটা নিয়ে পকেট থেকে কলম বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিল। সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল- অটোগ্রাফ, প্লীজ। খুব লজ্জা পেলাম। জীবন এমন অসম্ভবরকম সুন্দর হয় কে জানত!
আমাকে আরো বিস্মিত করতেই যেন সেই সপ্তাহে একটা জনপ্রিয় দৈনিকের সাপ্তাহিক সাহিত্য সাময়িকীতে ছয়টা গল্পের মধ্যে দুইটাকে বেশ প্রশংসা হল। বাকিগুলোকে বলা হল-‘নতুন লেখকের লেখা হিসেবে উতরে গেছে’। দু’টো গল্পের একটার নাম ছিলো ‘চাদর’। গল্পটাতে নিজের অনিচ্ছাতেই কিছুটা যেন আমার নিজের জীবনের ব্যাপার-স্যাপার ঢুকে গিয়েছিল। খুব সাধারণ গল্পটা এতো প্রশংসা পেল কেন কে জানে। গল্পটা লিখতে একটুও যেন ভাবতে হয়নি আমার। খুব তরতর করে লেখা এগিয়েছিল মনে আছে এখনো। আসলে সত্যি বলতে কি গল্পটা তানভির আর আমার দুঃসহ কিছুদিনের স্মৃতি থেকে লেখা। কিভাবে এক নারী তার স্বামীকে নেশামুক্ত করে তোলে তার একটা একটা অতি আবেগিক বর্ণনা। তানভির ঐ গল্পটা নিয়ে একটা শর্ট ফিল্ম বানাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। খুব তাড়াতাড়ি কিভাবে যেন একজন প্রোডিউসারও ম্যানেজ করে ফেলল। তারপর আমাকে নিয়ে পড়ল চিত্রনাট্য সাজাতে।
শর্ট ফিল্মের দর্শক আমাদের দেশে তখন ছিলই না বলতে গেলে। অল্প বাজেটের ছবি। অনেক টেলিভিশনে বিউটি সোপের বিজ্ঞাপণের বাজেটও নাকি এর চেয়ে বেশি হয়। তবু আমরা প্রবল উৎসাহে কাজ করতে লাগলাম। ফিল্মের উপর অনেক বই এনে দিল তানভির। বিশেষ করে চিত্রনাট্য বা স্ক্রিপ্টরাইটিং এর উপর। প্রত্যেকটা দৃশ্য সাজাতাম আমরা দু’জন মিলে। মাঝে মাঝে ছোটখাট বিষয় নিয়ে তর্ক হত খুব। তানভির রাগে গজগজ করত তর্কে এঁটে উঠতে না পারলে। ‘তোমার বেশি খুঁতখুঁতে স্বভাব’-ব’লে বাচ্চাদের মতন গাল ফুলাতো সে। সেই রাগ গলতেও সময় লাগত না।
দেখতে দেখতে আমাদের কাজ এগিয়ে চলল। প্রোডাকশন ইউনিট তৈরি হল, কাস্টিংও হয়ে গেল। ঐ সময়কার জনপ্রিয় একজন অভিনেত্রী নামমাত্র পারিশ্রমিকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে কাজ করতে রাজি হলেন। আমি ভাবতাম অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে বইপত্র পড়ার চল নেই। উনার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম পেলাম। এখানে ব’লে রাখা দরকার সত্যজিৎ রায়ের একটা সিনেমাতে কাজের অফার পেয়েও করতে পারেননি ব’লে খুব আফসোস ছিল তার। আমাদের স্ক্রিপ্ট পড়ে উনি নাকি আগেই বুঝে ফেলেছিলেন যে এটা একটা ভাল ফিল্ম হ’তে যাচ্ছে।
আমার স্কুলের ক্লাশ শেষ করেই গিয়ে জুটতাম তানভিরের ‘চাদর’-দলের সাথে। কাজের চেয়ে চা-সিগারেট-আড্ডা বেশি চলতে দেখলেই গিয়ে সবগুলোকে ধমকাধমকি শুরু করতাম। মাঝে মাঝে কাজ শেষ করে আড্ডায় বসতাম সবাই মিলে। এমনকি সেই খ্যাতিমান অভিনেত্রীও যোগ দিতেন মাঝে মাঝে। ভদ্রমহিলা প্রচণ্ড সুন্দরি। সবাই উনাকে ম্যাডাম বলে ডাকত। আসল বয়স কত কে জানে। চাইলে চব্বিশ-পঁচিশ হিসাবে নির্দ্বিধায় চালিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু মনে মনে একটা হিসাব করে দেখেছিলাম যদি উনি ষোল বছর বয়সেও ক্যারিয়ার শুরু করেন তো তখন তার বয়স হওয়ার কথা এখন কমসে কম ছত্রিশ; কিংবা কে জানে তার চেয়ে বেশিও হতে পারে। ক্যামেরাম্যান শহীদ ভাই ম্যাডামকে খুব একটা পছন্দ করেন ব’লে মনে হল না। প্রায়ই গজগজ করেন-‘কমার্শিয়াল ছবিতে মার্কেট না পেয়ে এখন আসছেন উনি অভিনয় দেখাইতে’। আউটডোরে কিছু শ্যুটিং হল। আমরা বেশ পিকনিক-পিকনিক ভাব নিয়ে সেগুলো শেষ করলাম। শ্যুটিং হল, এডিটিং হল, ডাবিং হল। মোটকথা আমাদের এগারো মাসের পরিশ্রম শেষে ‘চাদর’-নামের শর্টফিল্মটি মুক্তির আলো দেখার উপযুক্ত হল। ‘চাদর’ মুক্তি পেল ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৮৬ তারিখে।
ভারতীয় কিছু বাংলা সিনেমা হয়তো দেশবিদেশে অনেক পুরষ্কার জিতেছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরষ্কারের চিন্তা বাংলাদেশি পরিচালক-প্রযোজকরা খুব একটা করতেন না। তাছাড়া টেকনিক্যাল অনেক সীমাবদ্ধতাও ছিলো। বাজেট সমস্যা তো ছিলই। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ‘চাদর’ প্যারিসের এক চলচ্চিত্র উৎসবে দু’টো ক্যাটাগরিতে আন্তর্জাতিক পুরষ্কারের মনোনয়ন পেল। শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য(সমালোচক) আর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী(সমালোচক)। এতটা আমরা কল্পনাতেও ভাবিনি। মূলত বিদেশী পুরষ্কারের গন্ধ থাকায় দেশের মানুষ আগ্রহী হল ফিল্মটা দেখবে বলে। পত্রপত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠলাম আমরা। চলচ্চিত্র উৎসবের নিমন্ত্রণপত্র হাতে এলো। আমরা আমাদের স্বপ্নের শহর প্যারিসে যাওয়ার টিকেট হাতে পেলাম। কাকতালীয়ভাবেই হয়তো ফ্লাইটের তারিখ ছিল ১২ই মার্চ ১৯৮৮। সাত বছর আগে এইদিনে জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামাক্লাবে তানভিরের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। তানভিরের মনে ছিল কিনা সেটা আর জানা হয়নি।
আমরা পাঁচজন যাচ্ছিলাম। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটির সিইও, তানভির, আমি, ম্যাডাম আর সহকারি পরিচালক তানভিরের বন্ধু সাজ্জাদ ভাই। আমরা সবাই আনন্দে আত্মহারা। অবশেষে ইউরোপ যাচ্ছি; তাও পুরষ্কার জিতে আনতে। কিন্তু এই যাত্রা যে আমাদের দু’জনের জীবনকে এক ঝটকায় পালটে দেবে সেটা আগে থেকে জানলে কী করতাম আজ এই মূহুর্তে শুধু সেই কথাই মনে হচ্ছে। না, না, কোন আফসোস বা অনুতাপ আমার নেই।
(যতদূর মনে পড়ে এ একথাগুলো বলার সময় ভদ্রমহিলা বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছিলেন। কিন্তু পরমূহুর্তেই শক্তভাবে নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন তিনি।)
প্যারিসের সেই রাতটার কথা আমি ভুলব না। আমার জীবনের এক দগদগে ঘা। ১৪ই মার্চ ১৯৮৮। আমরা উঠেছিলাম প্লাস দ্য লা কনকর্দ এর কাছে ‘ওতেল দ্য ক্রিলন’-এ। প্যারিসের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে। চারপাশে আলোয় ঝলমল জাঁকজমকে ভরা প্যারিস শহর। দেশবিদেশ থেকে আসা ট্যুরিস্টদের জন্য স্বপ্নের শহর। অন্নদাশঙ্করের ভাষায় ‘অর্ধেক নগরী তার অর্ধেক কল্পনা’। আমরা নানারকম পরিকল্পনা করলাম কোথায় কোথায় ঘুরব, কি কি দেখব- এইসব নিয়ে।
সন্ধ্যায় কথা ছিল আমরা সবাই একসাথে ঘুরতে বের হব। কিন্তু বিকেলবেলা তানভির বলল ওর শরীরটা নাকি ভালো নেই। মনটা খুব খারাপ হল। সন্ধ্যায় আমাদের সবার কথা ছিল একসাথে ঘোরার। কিন্তু সাজ্জাদ ভাইয়ের চাপাচাপিতে রাজি হয়ে গেলাম। অবশেষে মাথাব্যথার জন্য তানভিরকে একটা এনালজেসিক খাইয়ে আমি, সাজ্জাদ ভাই আরে আরিফ সাহেব বের হলাম। লম্বা ফ্লাইটের কারণে টায়ার্ড লাগছে বলে ম্যাডামও হোটেলে থেকে গেলেন।
ট্যুরিস্টস্পটগুলোতে দিনের বেলায় সবাই মিলে একসাথে যাবো বলে আমরা তিনজন মিলে উইন্ডো-শপিং করে বেড়ালাম। ছোটখাটো কিছু কেনাকাটা করলাম, যেমন ফরাসি পারফিউম- যার নামই শুনি চিরকাল। রাস্তার ধারের ক্যাফেতে সামান্য খাওয়া-দাওয়াও করলাম। ফেরার পথে এক১টা এন্টিকের দোকানের থমকে দাঁড়ালাম।মাঝারি আকারের একটা মূর্তি খুব পছন্দ হল। দানাওয়ালা একটা পরীর মূর্তি।একটা পা ভাঁজ করা। এখনই যেন উড়াল দেবে অজানায়। অসাধারণ হাতের কাজ। নিখুঁত, জীবন্ত যেন। ভীষণ পছন্দ হল মূর্তিটা। ঝোঁকের বশে একগাদা পয়সা খরচ করে কিনে ফেললাম। আকারে মাঝারি হলেও বেশ ভারি মূর্তিটা। পাঁচ কেজির কম হবে না ওজন। সাজ্জাদ ভাই ওটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বয়ে নিতে চাইলেন। আমিই দিলাম না। জিনিসটা এতো পছন্দ হয়েছিলো যে কার হাতে দিতে ইচ্ছা করল না। তানভিরের শরীর খারাপ বলে তাড়াতাড়ি রওনা হলাম হোটেলের দিকে। তাও হোটেলে ফিরতে ফিরতে আমাদের রাত নয়টা বেজে গেলো। ডিনারের সময় ততক্ষণে পেরিয়ে গেছে। ওদের জন্য অবশ্য খাবার কিনে নিয়ে এসেছি।
তাড়াতাড়ি রুমের দিকে এগোলাম। তানভির হোটেলে রয়ে গেছিল বলে রুম খোলাই ছিল। ঢুকে পড়লাম। কেউ নেই। ফাঁকা ঘর। গেল কোথায় ও রুম খোলা রেখে। একবার ভাবলাম একা একা বোর হচ্ছিলো বলে হয়তো পাশের ঘরে ম্যাডামের সাথে আড্ডা দিতে গেছে। রুম থেকে বেরিয়ে সেদিকেই এগোলাম। দরজা বন্ধ থাকাটাই স্বাভাবিক। তবু বন্ধ দরজা দেখে বুকটা ধ্বক করে কেঁপে উঠল কেনো কে জানে।মাঝে মাঝে মানুষের মন কি দৃষ্টিসীমার আড়ালের অনেককিছু বুঝে ফেলে? দরজার ওপাশ থেকে যে প্রবল শীৎকার ধ্বনি আর শারীরিক আশ্লেষের শব্দ ভেসে আসছিলো তাতে আমার আর কোন কিছু বুঝে উঠতে বাকি রইল না। আমার প্রেমময় স্বামী তানভির বিশিষ্ট সুন্দরি অভিনেত্রীর সাথে আমার অনুপস্থিতিতে আমার বুকের জমানো সব ভালবাসাকে খুন করছে। অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে আমার অনুপস্থিতিতে ঐ ডাইনিটার সাথে।
আকাশ কিভাবে মানুষের মাথায় ভেঙ্গে পড়ে আক্ষরিকভাবে বুঝতে পারলাম। কাচের জারের মতন এতোদিনের ঠুনকো বিশ্বাস আর ভালোবাসা যেন হাত থেকে পরে ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। নিজেকে কেমন অনুভূতিশূন্য মনে হল। মাথাটা ফাঁকা। যেন কি ভাবতে হবে, কি করতে হবে-কিছুই আমি জানি না। এতোদিনের ভালোবাসা, বিশ্বাস, নির্ভরতা –ভেঙ্গে পড়ল এক নিমিষে। ভেঙ্গে পড়ল মূহুর্তের সুযোগে। চারদিকটা ভীষণ অর্থহীন ফ্যাকাসে দৃশ্যের রূপ নিল। ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ কী কোনদিন বুঝবে বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণা?
কিভাবে হেঁটে আমি নিজের ঘরে এলাম আমি জানি না।শুধু মনে আছে বিছানায় পাথরের মূর্তির মত বসে ছিলাম। প্রচণ্ড প্রতারিত আর উচ্ছিষ্ট মনে হতে লাগল নিজেকে। শুধু অবাক লাগতে লাগল এই দুর্বল চরিত্রের নোংরা মানুষটাকে এতোটা বছরেও কেন আমি চিনতে পারিনি।
আরও অদ্ভুত ব্যাপার হল, ঘন্টাখানেক পরে আমার স্বামী খুব স্বাভাবিকভাবে আমার ঘরে ধুকল। নোংরা একটা কীট! বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ বা পাপবোধের চিহ্ন বা ছায়া তার চোখেমুখে ছিল বলে আমার মনে পড়ে না। ঠিক সেই দিনটাতে আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম আমি আমার স্বামী তানভির হাসানকে খুন করব। নির্মম যন্ত্রণা দিয়ে মারব ওকে। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কতটা ভয়ানক আমি অকে বুঝিয়ে ছাড়ব। আর ঠিক করলাম, এই ঘটনাটা যে আমি জানি সেটা অকে কোনদিন বুঝতে দেব না।
ঘরে ফিরে খুব স্বাভাবিক আচরণ করল সে। যেন কিছুই হয়নি। গীজার অন করে শাওয়ারে যেতে যেতে খুব স্বভাবিকভাবে বলল, কেমন ঘুরলে প্যারিস শহর? প্রাণপণে চোখের পানি আর ক্রোধ সংবরণ করে স্বাভাবিক থাকার চেশটা করলাম। বললাম, তুমি গেলেই পারতে। খুব মজা হল। জানো, আমি না একটা পরীর মূর্তি কিনেছি।
সেটা দেখার খুব আগ্রহ দেখা গেল না তানভিরের মধ্যে। নিস্পৃহ স্বরে শুধু বলল, তাই নাকি? ভালো তো।
ও বাথরুমে ঢুকে যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করলাম, কী করলে এতোক্ষণ একা একা?- জবাব পেলাম না। জানি না ওর চোখেমুখে কোন দ্বিধা বা ইতস্ততভাব খেলে গিয়েছিল কিনা। আসলে আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না গোটা ব্যাপারটা। এতো সহজে ভেঙ্গে পড়ে সবকিছু! মনে হচ্ছে সব ভুল। সব। এরকম হতেই পারে না। আমার তানভির এটা করতেই পারে না। পৃথিবী উলটে যাক তবুও। ও কি জানে না ওকে আমার চেয়ে কেউ বেশি ভালবাসে না; বাসতে পারে না। তবু কেন ও এরকম করবে? কেন? কেন? কেন?
চিন্তাটা ফিরে এলো আবার। খুন করব। নৃশংসতমভাবে খুন করব। অনেক সময় নিয়ে মরবে ও। মরে যাবার আগে জানবে কী অপরাধ ও করেছে। মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হওয়ার আগে ওকে বুঝতেই দেব না আমি সব জানি। দৃঢ় একটা প্রতিজ্ঞা আমার সারা সত্ত্বা জুড়ে জায়গা করে নিল।
প্রতিহিংসার এই ঘোরের মধ্যে কিভাবে এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান শেষ হল, শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য আর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সমালোচক পুরষ্কার নিয়ে আমরা দেশে ফিরলাম কিছুই আমার স্মৃতিতে নেই। ঈর্ষা আর ঘৃণার আগুন বুকে নিয়ে তবু আমি হাসিমুখে কথা বলি আমার শ্রীমান স্বামী আর শ্রীমতি ম্যাডামের সাথে।মনে শুধু একটাই সঙ্কল্প। খুন করব। মৃত্যুর আগে ও জানবে ভালোবাসার কত বড় অপমান ও করেছে। কতবড় অকৃতজ্ঞ সে।
দেশে ফেরার পরে তিন মাস কেটে গেল। কোন পরিবর্তন এলো না আমাদের যুগল জীবনে। সব কিছু যেন স্বভাবিক। আগের মতন। পরস্পরের প্রতি আচার ব্যবহার আমাদের একটুও বদলায়নি। সেই একইরকমভাবে রাতে ওর জন্য খাবার নিয়ে অপেক্ষা করি আমি। প্যারিস থেকে আনা সেই মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে প্ল্যান করি। রাতে দেরি করে বাড়ি ফেরা বেড়েছে ওর।বুঝতে পারি ওই নায়িকার সাথে পুরোদমে সম্পর্ক চলছে ওর। নিজেকে যতটা তুচ্ছ মনে হয় আমার ঘৃণার আগুন দিয়ে সেতা চাপা দিয়ে রাখি।
সময় নিয়ে পরিকল্পনা করি খুনের। কোন খুঁত রাখব না। নিখুঁতভাবে খুন করব আমি আমার লম্পট স্বামীকে।
দিন যায়। কয়েকটা বছরও পেরিয়ে যায়। আমি আমার পরিকল্পনা সাজাতে থাকি। ওর রাত করে বাড়ি ফেরা বাড়তে থাকে। স্বামী স্ত্রীর স্বভাবিক সম্পর্কে আমাদের আরও দূরত্ব তৈরি হয়। এল্কোহলের গন্ধ পাই জামাকাপড়ে-মুখে। কিছু বলি না। শার্টে লম্বা চুল লেগে থাকে। আন্ডারয়্যআরে থাকে মেয়েলি সিমেনের দাগ। খুন করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সব কিছু এড়িয়ে যাই। একটা বিষ দরকার। এমন একটা বিষ যেটা প্রচণ্ড যন্ত্রণা দেবে মৃত্যুর আগে বিষটাকে হতে হবে আনট্রেসেবল যেন মৃত্যুটাকে মনে হয় স্বাভাবিক হার্ট এটাক। যেন পোস্টমর্টেমে ধরা না পড়ে।
ধীরে ধীরে সময় যায়। ভালোবাসার দুর্বলতা নাকি সাহসের অভাব ঠিক কোন কারণে যে আমার সেই বিষ আর যোগাড় করা হয়ে ওঠে না। এরই মধ্যে শারীরিক অনিয়ম আর অতিরিক্ত এল্কোহলের জন্য তানভীরের লিভারে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিলো। শরীর ভেঙ্গে পড়ল। দেশের সবচেয়ে ভালো ডাক্তারের শরণাপন্ন হলাম। দিনরাত ভুলে গিয়ে ওর বিছানার পাশে সেবাশুশ্রূষাতে বসে থাকলাম সতী সাবিত্রীর মতন। অসুস্থ একটা মানুষ্কে খুন করার কোন মানে হয় না।মাঝে মাঝে এটা ভেবে যেমন শান্তি পেতাম যে ওর পাপের শাস্তি পাচ্ছে আবার মাঝে মাঝে ওর জন্য কষ্টও সহ্য হত না। এক মূহুর্তের জন্যেও ওর বিছানার কাছ থেকে ঊঠতাম না। ঊঠতে পারতাম না। ওকে মারতে যে ওকে আমার সুস্থ করা দরকার।
ডাক্তারের পরামর্শে ওকে দেশের বাইরে নিতে হল। সিংগাপুর গেলাম। মাউন্ট এলিজাবেথে চিকিৎসা হল। দিনরাত খেটে ওর পাশে বসে ওর সেবা করলাম। সেই অসুস্থ সময়গুলোতে ফ্যালফ্যাল করে ছেয়ে থাকত ও আমার দিকে। চোখে থাকত কৃতজ্ঞতা, মায়া, ভালবাসা। আসলেই কি ভালবাসা? স্বার্থের খাতিরে কৃতজ্ঞতা? স্বার্থের জন্য মায়া। অসুস্থতার অসহায়তায় করুণা প্রার্থনা?
প্রায় চার মাস চিকিৎসা চলল। দু’চোখের পাতা এক করে নিশ্চিন্ত ঘুম ঘুমাতে পারিনি এই চার মাস। সারাটাক্ষণ পাশে বসে ওর সুস্থতা কামনা করেছি আর কিভাবে আরও যন্ত্রণাদায়ক ও গোপনীয়তার সাথে ওকে খুন করা যায় এই পরিকল্পনা করেছি। ঘৃণার আগুন যে সারা শরীরে জ্বলত। ঘুমাব কিভাবে? অন্ধ একটা ক্রোধ, ঘৃণা আর অভ্যাসগত ফালতু একটা ভালোবাসা বুকে নিয়ে বসে থাকতাম আমার বিশ্বাসঘাতক অসুস্থ স্বামীর বেডের পাশে।
ডাক্তারি বহু বিধিনিষেধসহ মোটামুটি সুস্থ হল তানভীর অবশেষে। বাইরে থেকে আমাদের সম্পর্ক, আন্তরিকতা বা পারস্পরিক বোঝাপড়া সেই আগের মতই আছে। ভিতরে ভিতরে ভাঙ্গাগড়া সব হয়ে গেছে ততদিনে। সেটা ও নিজেও জানে। আমার নিজের বুক জুড়ে শুধু একটাই অনুভূতি কাজ করে। একটা খুন করার ইচ্ছা।
সুস্থ হওয়ার পরপরই আমার নির্লজ্জ স্বামী সেই আগের জীবনে ফিরে গেল। বছর গড়ায়। ফিল্মমেকিং, অ্যাডমেকিং, পার্টি, উজ্জ্বল চেহারার মডেলদের সঙ্গ, এল্কোহল ইত্যাদি ইত্যাদি। শরীরে তার কোলেস্টেরল জমে। চশমার আড়ালের ঝকঝকে চোখজোড়াও উজ্জ্বলতা হারায়।
আমি আমার লেখালেখি নিয়ে থাকি। পয়সাওয়ালা একটা এনজিও-তে কাজ করি। প্রায় বিনা পরিশ্রমে অঢেল আয় করি। দ’জনের বেশ বিচ্ছিন্ন জীবন কাটে। কিন্তু একটা মূহুর্তের জন্যেও সেই খুনের পরিকল্পনা আমার মাথা থেকে যায় না।
আমার অফিস্টা বেশ আধুনিক। হাই-স্পীড ইন্টারনেটের সুবিধা আছে। সেদিন অফিসে বসে টক্সিকোলজির একটা ওয়েবসাইট ঘাটছিলাম। হল্যাণ্ডের একটা কেমিক্যাল মেনুফ্যাকচারিং কোম্পানি। অনলাইন অর্ডার দিয়ে কেমিক্যালস আনা যায় দেশে। ওরা নানারকম পেস্টিসাইড, ওষুধ তৈরিতে দরকারি পয়জনাস কেমিক্যালস বানায়। ওষুধ কোম্পানিগুলো চাইলে আলাদা আলাদা কেমিক্যালস কিনতে পারে। কিন্তু রেজিস্টার্ড আর লাইসেন্সড ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ছারা ওরা শিপমেন্ট করে না। আরও অনেকগুলো ওয়েবসাইট ঘেঁটে একই তথ্য পেলাম। দমে গেলাম না। বাংলাদেশ পুলিশের ফরেন্সিকের অচেনা কোন বিষই আমি ব্যবহার করব। সবচে ভাল হয় যদি বিষটা কোন ওশুধের উপাদান হয়। সেক্ষেত্রে বাইরে থেকে আনার সুবিধা।
জয়েন্ট স্টক অফিসে গেলাম। দালাল ধরে কেমিক্যালস ইমপোর্ট ফার্মের রেজিস্ট্রেশন করালাম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিলাম। পারসোনাল ব্যাংক একাউন্ট প্রায় ফাঁকা করে ঘুষের টাকা যোগালাম। ভুয়া নামসর্বস্ব একটা কেমিক্যাল ফার্ম তৈরি হল। কাগজপত্রে কোন খুঁত রাখলাম না। আমি আগেই বলেছি আমি খুব মেথডিক্যাল মানুষ। যে কাজ করি সেটা নিখুঁত ভাবে করি।
কাগজপত্র সব রেডি করে পাঠালাম সেই কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিং ওয়েবসাইটে। অন্য মেডিক্যাল ওয়েবসাইট ঘেঁটে এমন একটা টক্সিক বেছে নিলাম যেটা একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর লিভার, ব্লাড বা ফুসফুসে কোন আলামত রাখবে না। তারপর ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করে সেই টক্সিকটাই অর্ডার করলাম। ওয়েবসাইট থেকে জানালো শিপমেন্টে চৌদ্দদিন সময় লাগবে। সময়টা কিভাবে যেন চমৎকারভাবে মিলে গেল। কারন ঐ চৌদ্দদিনের মাত্র কয়েকদিন পরেই ছিল আমাদের ম্যারেজ ডে।
তানভির সেলেব্রিটি হয়ে যাওয়ার পর ঐ মাঝবয়সি নায়িকার সাথে সম্পর্কের কথা ট্যাবলয়েডগুলোতে রসালোভাবে অহরহ আসতে লাগল। আমার অফিসের কলিগরাও সেগুলো যেন আমার দৃষ্টিগোচরে থাকে এমন জায়গাগুলোতেই রাখত। আমি বরং তাদের ধন্যবাদ দেই। কারণ ওগুলো আমার জেদটাকে আর উস্কে দিত।
চৌদ্দদিন যেন পেরতে চাইছে না। নিজের অধৈর্যভাব চাপা দিয়ে আমি স্বাভাবিক থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করি। তানভিরের শরীর স্বাস্থ্যের খবর নিই। মাঝে মাঝে খুব স্বাভাবিকভাবে ওই ডাইনিটার কথাও জিজ্ঞেস করি। যেন ঐ মহিলার অস্তিত্ব আমি মেনে নিয়েছি। ওর শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে উদবেগ দেখাই। লিভারে একবার সমস্যা হলে একদম সেরে ওঠা মুশকিল। আমি যেন কত স্বামী-অন্ত-প্রাণ-স্ত্রী!
সব অপেক্ষার পালা শেষ হয়। সেই পয়জনের ভায়াল সুরক্ষিত হিমায়িত এয়ার-টাইট বাক্সে আমার হাতে এসে পৌঁছল ১৭ই এপ্রিল ২০০৩ তারিখে। ১৯ শে এপ্রিল আমাদের ম্যারেজ ডে। এই দিনটাই বেছে নিলাম।
১৯শে এপ্রিল। যত্ন করে ওর পছন্দের মাটন বিরিয়ানি রাঁধলাম। যথেষ্ঠ পরিমাণ বিষ তাতে মেশালাম। ভাগ্য ভাল বিষটাতে কোন উৎকট গন্ধ নেই। ডিনার টেবিলে খাবার সাজিয়ে আমি আমার স্বামীপ্রবরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। এই সময় শোকেসে রাখা সেই শ্বেতপাথরের পরীর মূর্তিটার দিকে চোখ গেল। মনে পড়ে গেল সেই নোংরা রাতটার কথা। নিঃশংসয় বিবেক নিয়ে একটা খুনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
আমার স্বামী এলেন রাত এগারোটায়। যথারীতি টলতে টলতে। পার্টিতে গেলে নাকি কিঞ্চিত ওয়াইন খেতেই হয়।
তিথি, আমি আজ খাব না। খেয়ে এসেছি। তুমি খেয়ে নাও।-গলা জড়ানো। হায়রে আমার ভালোবাসা। ম্যারেজ ডের কথাও তার মনে নাই। রাগ, দুঃখ আর অপমান চাপা দিলাম খুন করার উত্তেজনায়।
-খাবে না মানে! খেতেই হবে। আজকে আমাদের ম্যারেজ ডে। আমি তোমার সব পছন্দের খাবার করে নিয়ে বসে আছি। একটু হলেও খেতে হবে।
ছেলেমানুষী কোর না তো। এই বয়সে ওটা মানায় না। চলো কালকে কোথাও সেলিব্রেট করি। বাড়িতে একটা পার্টিও দিতে পারি আমরা। আমার তো মনে হয় সেটাই বেস্ট হবে।
জেদ চেপে গেলো আমার। বললাম-তোমাকে খেতেই হবে।
-আহ্, জোর করছ কেন? আমি খেয়ে এসেছি। এখন কিছুই খেতে পারব না। আর তুমি ত জানোই আমি কোলেস্টেরলের জন্য রিচ ফুড এভয়েড করি।
মনে মনে বললাম- রিচ ফুড এভয়েড কর আর নষ্ট লিভার নিয়ে ওয়াইন খেতে কোন সমস্যা নেই।
জোরে জোরে বললাম- খেতেই হবে, প্লিজ। আজকে একটা বিশেষ দিন। আমি সন্ধ্যে থেকে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য। অথচ তুমি দিনটার কথা ভুলেই গেছ। শুধু আমার কথা ভেবে এক চামচ অন্তত মুখে দাও।
টলতে টলতে টেবিলে এসে বসল সে। -দ্যাখো, আমার পেটে একটুও জায়গা নেই। তাছাড়া এই কোলেস্টেরলওয়ালা বিশ্রি বিরিয়ানি খাইয়ে তুমি আমাকে মারতে চাও?
-তোমাকে খেতেই হবে। রাগ উঠে গেল আমার।
-আমি খাব না এই বুলশীট।
-খেতেই হবে। আমি তোকে খাইয়েই ছাড়ব। এই খাবার তৈরি করতে আমার সাত মাস সময় লেগেছে। আমার হাজার হাজার তাকা গচ্চা গেছে। তোকে খেতেই হবে শূয়োরের বাচ্চা।
ফ্যালফ্যাল করে ও আমার দিকে তাকিয়ে আমার কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা করল। মাতাল দেহে কোন সাড় পাচ্ছে না। কথার অর্থও বুঝতে পারছে না। কিন্তু মাতালের মত স্বাভাবিক জেদে বলেই চলল-আমি খাব না, খাব না, খাব না। দেখি কিভাবে তুই খাওয়াস।
দেখবি কিভাবে খাওয়াবো তোকে?-বলে টেবিল থেকে উঠে শোকেস থেকে সেই ভারি শ্বেতপাথরের পরীর মূর্তিটা নামিয়ে আনলাম। নির্বোধ চোখে তাকিয়ে রইল ও আমার দিকে। কি করতে যাচ্ছি বুঝে উঠতে পারছে না।
ধীরে ধিরে বললাম-ভালবাসার ঘর বেঁধেছিলি না শুয়রের বাচ্চা? তারপর ফস্টিনস্টি করলি ওই নষ্টা মেয়ে মানবুষের সাথে। লম্পটের বাচ্চা লম্পট কোথাকার! তোর এই খাবারে আমি বিষ মিশিয়েছি। তুই এটা খাবি আর মারা যাবি। আমি সেই দৃশ্যটা উপভোগ করব। প্যারিসের সেই রাত থেকে আমি আজকের দিনটার জন্য অপেক্ষা করছি। খা। প্রাণ ভরে খাবি তুই। খেয়ে মরবি।
তানভীর যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু নির্বোধের মত মাথা নাড়ছে, না... না। তিথি প্লিজ...। তুমি আমাকে মারতে পারো না। আমি এই খাবার খাবো না।- বলে কাঁপা হাতে খাবারের ডিশ ছুঁড়ে দিল সে টেবিল থেকে।
রাক্ষুসী যেন ভর করল আমার উপর। মূর্তিটা নিয়ে প্রচণ্ড আক্রোশে বাড়ি মারলাম ওর মাথায়। ভারি মূর্তির এক আঘাতেই মাথার ঘিলু থেতলে যাবার কথা। কিন্তু এতদিনের জমানো ক্ষোভ আর অপমান আমাকে থামতে দিল না। উপর্যুপরি আঘাত করতে লাগলাম আমি ওর মাথায়। থ্যাতলান করোটি ভেঙ্গে ঘিলু ছিটকে বেরিয়ে এলো। আমার দু’হাতে সেই অর্ধতরল ঘিলু মেখে একাকার। নিথর হয়ে টেবিলে মাথা রেখে পড়ে রয়েছে তানভীর। আমি জানি ও এখন মৃত।
পিশাচ হয়ে গেছিলাম আমি। ভয়ানক জেদ ভর করেছিল আমার উপর। যে বিষ খাইয়ে ওকে মারব বলে এত কষ্ট আর ধৈর্য ধরেছিলাম, সেটা খাইয়ে ছাড়বই, এই একটা চিন্তাই মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। মাটিতে পড়ে থাকা খাবারের ডিশ থেকে মুঠো মুঠো খাবার তুলে ওর ঈষৎ হা করা গালে ঠেসে ভরতে লাগলাম। মৃত মানুষটাকে আরও বেশি করে যেন মারতে চাইলাম আমারই তৈরি করা বিষ দিয়ে। আরেক মুঠো বিষ-মাখানো খাবার ভরলাম ওর গাল টিপে ধরে হা বড় করে। আরেক মুঠো... আরেক মুঠো... থামলাম না। একসময় যখন মনে হল যে পরিকল্পনা করে খাবারে বিষ মিশিয়ে ওকে আমি মারতে চেয়েছি, সেটা ত হয়েছেই। থামলাম তখন। ঘেমে নেয়ে গেছি আমি তখন।
আমার হাতে তখনও তানভীরের ফেটে যাওয়া মাথার ঘিলু লেগে আছে। যন্ত্রচালিত পিশাচের মত আমি সেই অর্ধতরল ঘিলু মাখা আঙ্গুল মুখে পুরে চাটলাম। ডাক্তার সাহেব, বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, মানুষের টাটকা কাঁচা ঘিলুর স্বাদ কিন্তু খরাপ না। কচকচে আবার নরম নরম। আপনিও খেয়ে চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
(জবানবন্দির এই পর্যায়ের পর ভদ্রমহিলা অসুস্থ হয়ে হড়হড় করে বমি করা শুরু করেছিলেন। আমি উপস্থিত মেডিকেল এসিস্ট্যান্টকে কোনমতে বললাম উনাকে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে।)
Tuesday, October 14, 2008
Some more facts about human body language
ভ্রম
ভ্রম
আহসানুল করিম
রচনাকাল: ফেব্রুয়ারি ২০০৮
এক
ভয়ানক মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটছে সৈকতের। অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটছে। সেগুলো এতই আজব যে নিজের মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে ক্রমেই সন্দিহান হয়ে উঠছে সে। সহজ স্বাভাবিক জীবনে হঠাৎ করে ব্যাখ্যাতীত সব ব্যাপার এসে পড়লে কার পক্ষেই বা স্বস্তিতে থাকা সম্ভব? কাউকে কিছু বলতেও পারছে না। কেউই বিশ্বাস করবে না ওর কথাগুলো। চাপাবাজ না হয় পাগল ঠাউরে বসবে। অথচ সারাদিনে এই একটা ব্যাপারই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ভীষণ অসহায় লাগছে নিজেকে। সেদিন আশিককে বলতে গিয়েও বলতে পারল না। আশিক সৈকতের রুমমেট এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সৈকত সাধারণত আশিকের কাছে কিছুই লুকোয় না। তবু বলতে পারল না। বলতে গিয়ে নিজেকে এমন বোকা বোকা লাগল।
বিকেল বেলা। রোদ নিস্তেজ হয়ে এসেছে। হলের সামনের ছোট মাঠটাতে ছেলেরা প্রচুর হৈ হট্টগোল করে ক্রিকেট খেলছে। টেপ্ টেনিসে খেলা হচ্ছে। করিডোরে দাঁড়িয়ে অনেকেই খেলা দেখছে।
সৈকতের পুরো নাম সৈকত ইসলাম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সি.এস.ই ডিপার্টমেন্টের ছাত্র। চালচলন আর দশটা সাদাসিধে ছেলের মতন। বয়সের তুলনায় একটু বেশি গম্ভীর। আশিকুর রহমান অর্থাৎ সৈকতের রুমমেট আশিক আবার সম্পূর্ণ বিপরীত। ক্ষ্যাপাটে। পড়ে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। শখ হল তার বাঁশি বাজানো। বিকেল বেলা আশিক রুমে থাকে না। বিকেলে প্রায়ই সেশনাল ক্লাশ থাকে ওর। যেদিন সেশনাল থাকে না সেদিন থাকে টিউশনি। আর যেদিন ক্লাশ বা টিউশনি কোনোটাই থাকে না, সেদিনও বিকেল বেলা ঘরে বসে থাকার মানুষ নয় সে। সৈকত একাই ছিল তাই। প্যাকেটের শেষ বেনসনটা ধরিয়ে সে ঘর থেকে বেরল। চিৎকার শুনে মনে হচ্ছে খেলা ভালই জমেছে। রেলিঙে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্কভাবে সিগারেট টানতে টানতে খেলা দেখতে লাগল।
নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক একটা শব্দ বেরল। নাহ্, কিছুই ভাল্লাগছে না। সারাদিন ঐ একই চিন্তা মাথায় খচখচ করছে। কোথাও থেকে ঘুরে আসবে নাকি বিকেলটা? কিন্তু কোথায় যাবে? বড্ড ঘরকুনো স্বভাব সৈকতের। বন্ধু বান্ধবও খুব বেশি নেই। যারা আছে তাদের সাথেও সে খুব বেশি সময় কাটায় না। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক চিরে। হ্যাঁ, বড্ড একা সে, সন্দেহ নেই। কিছু কিছু মানুষ থাকে যারা সবসময়ই একা। লোনার। কাউকে খুব কাছে টানতে পারে না। কারও খুব কাছেও যেতে পারে না। সৈকত খানিকটা ঐ রকম। একেবারেই যে মানুষের সাথে মেশার চেষ্টা করেনি, তা নয়। করেছে। কিন্তু লাভ হয়নি।
হঠাৎ শোরগোল। যথারীতি মাঠে এল.বি.ডব্লিউ এর সিদ্ধান্ত নিয়ে গন্ডগোল। কেউ কাউকে ছাড়বে না। খেলা ভন্ডুল হওয়ার মতন অবস্থা। আঙুলের টোকায় ফুরিয়ে আসা সিগারেটটা দূরে ছুঁড়ে ফেলল। হঠাৎ করেই যেন পড়ন্ত বিকেলটাকে খুব বেশি বিবর্ণ মনে হতে লাগল।
প্রথমবার ঘটনাটা ঘটেছিল নয়দিন আগে। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। শেষ শ্রাবণের বর্ষায় ভিজে যাওয়া একটা দিন। কিছুতেই পড়ায় মন বসছিল না। ভীষণ বিরক্ত লাগছিল পড়তে। মাথায় ঢুকছিল না কিছুই। কিন্তু কিছু করার নেই। শনিবার Artificial Intelligence এর Class test. এই কোর্সের আগের ক্লাশ টেস্টটা খুব খারাপ হয়েছে। সুতরাং শনিবারের পরীক্ষাটা ভালো দিতেই হবে। Artificial Intelligence মানে হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সায়েন্স ফিকশন পড়তে খুব পছন্দ করে বলে এই কোর্সটা নিয়ে একটা আলাদা আগ্রহ ছিল ওর। কিন্তু ক্লাশে স্যার পড়াতে শুরু করার পর কখন যেন কৌতূহলটুকু বিতৃষ্ণায় পরিণত হল। সেটা টের পেল প্রথম ক্লাশটেস্টের আগের দিন রাতে পড়তে বসে।
রাত সোয়া একটার দিকে হাল ছেড়ে দিল। সিদ্ধান্ত নিল ঘুমিয়ে পড়বে। সকালে তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে বসবে। মোবাইল ফোনে এলার্ম সেট করল। একটা সিগারেট ধরিয়ে টেবিল ল্যাম্পটা অফ করে শুয়ে পড়ল বিছানায়। আশিক ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ আগেই। অন্ধকার ঘরটার এক কোণে শুধু জ্বলন্ত সিগারেটের আগুনের ক্ষণিকের জন্য উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ওঠা আর আবার ঝিমিয়ে আসা। শেষ হয়ে আসা সিগারেটটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দিল। পায়ের কাছে আগোছাল হয়ে পড়ে থাকা চাদরটা টেনে দিল। বৃষ্টি হওয়ায় শীত শীত লাগছে। ঘুমের জন্য আদর্শ পরিবেশ। কিন্তু ঘুম আসছে না। বেশ কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ ওপাশ করল। অস্থিরভাবে মোবাইলটাতে সময় দেখল। পোনে দু'টো বাজে। গল্পের বই পড়বে বলে ঠিক করল। হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে দিল। তারপর বালিশের পাশে বেশ কিছু দিন ধরে পড়ে থাকা সিডনী শেলডনের থ্রিলারটা খুলে চোখের সামনে ধরল। নাম "Tell Me Your Dreams''|
পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে গেছে টেরও পেল না। দুঃস্বপ্ন দেখল। বিশাল একটা মাঠ। ভীষণ নির্জন। চারিদিকে সুনসান নৈঃশব্দ। একটা অপার্থিব ভূতুড়ে আলোয় মাঠের মধ্য দিয়ে সে হেঁটে যাচ্ছে। পিছনে পিছনে কেউ আসছে। কিন্তু উল্টো ঘুরলে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কিভাবে যেন সে নিশ্চিত যে কেউ তার পিছু নিয়েছে। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। ভয়ে ভয়ে পিছনে ফিরল। এবার দেখা গেল লোকটাকে। ভীষণ চেনা চেনা লাগল। কিন্তু চিনতে পারল না। শুধু বুঝতে পারল লোকটা তাকে হত্যা করতে চায়। দৌড়াতে শুরু করল সে। পিছনের লোকটাও দৌড়াচ্ছে। দৌড়াতে দৌড়াতেই আবার পিছনে তাকাল। এবার চার হাত পায়ে ভর দিয়ে জানোয়ারের মতন ছুটতে শুরু করেছে লোকটা। দু’পায়ের হাঁটু শ্বাপদের মত উল্টোদিকে ভাঁজ হয়ে আছে। চিতার মত ক্ষিপ্র। দূরত্ব কমে আসায় চেহারাটা আরও স্পষ্ট হল। ভীষণ রকম চেনা একটা মুখ। ক্রমেই কমে আসছে দু’জনের মধ্যকার দূরত্ব। নেকড়ের মত দেহ নিয়ে ছুটে আসা লোকটার মুখ যেন ধীরে ধীরে সূঁচালো হয়ে উঠতে লাগল। শ্বদন্ত বেরিয়ে এল। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ছুটে আসছে ওটা ভীষণ গতিতে।
দুই
আচমকা সামনে ফিরে দেখে মাঠের শেষে পৌঁছে গেছে। সামনে খাদ। একেবারে খাদের কিনারে এসে থামল। নিচে অতল অন্ধকার। পিছনে ছুটে আসছে একটা হিংস্র আধা মানুষ আধা জানোয়ার। একই সাথে দু'টো ব্যাপার হল। স্বপ্নে যেমনটা হয়। প্রথমত, পিছনের প্রাণীটার মুখ কেন চেনা চেনা মনে হচ্ছিল সেটা বুঝতে পারল। হিংস্র ওই জন্তুটার মুখ আর কারও নয়, ওর বাবার। দ্বিতীয়ত, কেউ যেন ওকে ধাক্কা দিল। তাল সামলাতে না পেরে খাদের মধ্যে পড়তে শুরু করল সে। বেপরোয়াভাবে হাত-পা দিয়ে পতন ঠেকাতে চাইল। পারল না। হা করে থাকা কালো অন্ধকার গহ্বর যেন গিলে ফেলতে চাইল তাকে।
ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে গেল। টেবিল ল্যাম্পটা তখনও জ্বলছে। ঘেমে নেয়ে গেছে সে। উঠে বসল। বিছানার পাশে রাখা পানির বোতলটা উঠানোর জন্য ফিরতেই একটা ধাক্কা খেল। এ কীভাবে সম্ভব?
ধড়মড় করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল সৈকত। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল বিছানার দিকে। অবাস্তব একটা পরিস্থিতিতে পড়েছে সে। জানাশোনা পৃথিবীর কোনো নিয়মেই সামনের দৃশ্যটা সত্য হতে পার না। প্রচন্ড বিস্ময়ের মুখে দাঁড়ালে মানুষের হঠাৎ সবকিছু ওলটপালট লাগে। সবকিছু কেমন অর্থহীন মনে হতে থাকে। যুক্তির শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে শুরু করে তখন। এই মুহূর্তে সৈকতের সেই একই অবস্থা।
বিছানায় অবিকল আরেকটা সৈকত শুয়ে আছে। ঘুমে অচেতন একটা দেহ। ধীর লয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস বইছে। চোখের মনি নড়ছে। Rapid Eye Movement- স্বপ্ন দেখছে হয়তো। ঠিক যে ভঙ্গিতে সে শুয়ে অভ্যস্ত, সেভাবেই পড়ে আছে ঘুমন্ত দেহটা। দু’হাতে চোখ কচলে নিল। হাতে চিমটি কাটল। নাহ্, দুঃস্বপ্ন নয়। পরিস্থিতিটা এমন অদ্ভুত। একই মানুষের দু’ দু'টো কপি। একটি ঘুমন্ত আর আরেকটি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে অন্যটির দিকে ফ্যালফ্যাল করে। ভয়ে ভয়ে ঘুমন্ত দেহটা আলতো করে স্পর্শ করল এবং শিউরে উঠল। তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিল। বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়ে যুক্তি দিয়ে ভাবতে চেষ্টা করল কী ঘটছে আসলে।
তার সামনে বিছানায় সে নিজে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। নাহ্, সে নিজে নয়। অবিকল তার একটা প্রতিমূর্তি। কারণ সৈকত নিশ্চিত যে সে জেগে আছে এবং দাঁড়িয়ে আছে। একটা মানুষ হুট করে দু'টো মানুষ হয়ে যায় কীভাবে! শুয়ে থাকা মানুষটাকে সে ছুঁয়েও দেখেছে। নিজের ইন্দ্রিয়গুলোকে কিভাবে অবিশ্বাস করবে সে?
এমন সময় মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল সৈকতের। হাত পা অবশ হয়ে আসতে চাইল। সামনের দৃশ্য ঝাপসা হতে হতে অন্ধকার হয়ে এল। পড়ে যাওয়ার সময় চেয়ারে ধাক্কা লেগে যে শব্দটা হল সেটা শোনার পর আর কিছু জানল না সে। জ্ঞান হারালো।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল অনেক দেরিতে। সকাল দশটা বেজে গেছে ততক্ষণে। মোবাইলের এলার্মে ঘুম ভাঙেনি। জানালা দিয়ে রোদ এসে সারা ঘর ঝকঝক করছে। মেঘ নেই আকাশে। প্রায় তিন দিন পর সূর্যের দেখা পাওয়া গেল। আশিকের বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখল তখনো ঘুমোচ্ছে। ছুটির দিনের আগের রাতগুলোতে কী সব খেয়ে যেন নেশা করে। পরের গোটা দিনটাই ঘুমিয়ে কাটায়। ব্যাপারটা একটা সাপ্তাহিক রুটিনে দাঁড়িয়ে গেছে। সৈকতের নিষেধ গ্রাহ্যই করে না।
উজ্জ্বল দিনের আলোতে রাতের পুরো ব্যাপারটা অদ্ভুত একটা স্বপ্ন বলেই মনে হল। বিছানায় বসেই বেশ কিছুক্ষণ ভাবল। কী আজব স্বপ্ন! আর এমন বাস্তব অনুভূতি। টেবিল ল্যাম্পটা তখনও জ্বলছিল। নিবিয়ে দিল ওটা। মাটিতে পড়ে থাকা ইংরেজি পেপারব্যাকটা তুলে রাখল। রাতে গল্পের বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যাওয়া ওর অনেক দিনের অভ্যাস। হয়তো ব্যাপারটাকে স্বপ্ন ভেবে নিয়ে ভুলেই যেত সৈকত। কিন্তু শনিবার দুপুর বেলা একই ঘটনা ঘটল দ্বিতীয়বারের মত।
আগের ক্লাশটেস্টগুলোতে মার্কস ভাল পায়নি বলে রাত জেগে প্রস্তুতি নিয়েছিল। ভোরবেলা ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়ে ক্লাশে গেল। রাত জাগার ক্লান্তি সত্ত্বেও পরীক্ষা খারাপ হল না। হলের ডাইনিং-এ কোনোরকমে লাঞ্চটা সেরে রুমে ফিরল। আশিকের কম্পিউটারটা অন করে পছন্দের প্লেলিস্টটা চালিয়ে দিল। একটা সিগারেট ধরিয়ে কাপড় না ছেড়েই বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
সিগারেটটা শেষ হতে না হতেই তন্দ্রা এসে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। জানালা দিয়ে আসা বৃষ্টির ছাঁট এসে গায়ে লাগতেই ঘুম ভেঙে গেল। উঠে জানালা বন্ধ করল। আবার শোবে। বিছানার দিকে ফিরতেই চমকে উঠল। ঐ তো শুয়ে আছে সে, অবিকল তার মতন দেখতে মানুষটা। একই পোশাক পরা। দ্রুততর হল হৃদস্পন্দন। তার মানে সেদিন রাতে সে কোনো স্বপ্ন দেখেনি। বিড়বিড় করে নিজের অজান্তেই আয়তুল কুরসি পড়তে শুরু করল- ‘‘আল্লাহু লা-ইলাহা ইল্লা হু-য়াল হাইয়ুল কাইয়ুম......।’’ পুরোটা শেষ করার আগেই জ্ঞান হারাল।
হুঁশ ফিরল বিকেল পাঁচটার দিকে। বিছানায় যেভাবে শুয়েছিল ঠিক সেভাবেই শুয়ে আছে সে। চোখ মেলে সকাল না বিকেল প্রথমে ঠিক বুঝতে পারছিল না। জানালার বাইরের মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর মরা আলোর জন্য একবার সকাল আর একবার বিকেল বলে মনে হতে লাগল। দুপুর বেলা গভীর ঘুম হলে এরকম হয় অনেক সময়। ঘড়ি দেখে বুঝল সন্ধ্যা হতে চলেছে। চুপচাপ শুয়ে ছাদের দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে রইল। চোখে শূন্য একটা দৃষ্টি।
তিন
ভাবছিল সে। মানুষের দেহ, আত্মা এইসব নিয়ে। ইন্টারমিডিয়েটে তার বায়োলজি সাবজেক্টটা ছিল না। তার বদলে নিয়েছিল পরিসংখ্যান। আর এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ফলে, মানুষের ব্রেন আর অনুভূতি কিভাবে কাজ করে, সে পুরোপুরি জানে না। পৃথিবীর বিজ্ঞান কি সবকিছু জানে? সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারে?
সারাদেহে ছড়িয়ে থাকা স্নায়ুগুলো যে সিগন্যাল বয়ে নিয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়, সেগুলোই নাকি অনুভূতির জন্ম দেয়। এতটুকুই জানে সে। তারমানে স্নায়ূগুলো উল্টোপাল্টা আচরল করলে চারপাশের জগৎ সম্পর্কে আমাদের অনুভূতিও ভ্রান্ত হতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা নাকি মানুষের ঘুম, স্বপ্ন এগুলো নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। প্যারাসাইকোলজি নামে অস্বাভাবিক মনস্তত্ত্বের উপর মনোবিজ্ঞানের একটি শাখাই রয়েছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে কিছু বহুল প্রচলিত উপন্যাস ছাড়া কিছুই পড়া হয়নি-উপলব্ধি করল সৈকত। হুমায়ুন আহমেদের মিসির আলি চরিত্রটির কথা মনে হলো। উনি থাকলে কিভাবে ব্যাখ্যা করতেন ওর ব্যাপারটা?
উনি হয়তো পুরোটা শুনেই বলতেন আবার ঘটনাটা বলতে। নোটবুকে কিছু কিছু ব্যাপার টুকে রাখতেন। বারবার পড়ে কথাগুলোর মধ্যকার খটকাগুলো বের করে লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করতেন এবং পরের দিন সোজা এসে অবচেতন মন-স্বপ্ন-অবদমিত আবেগ-হেলুসিনেশন ইত্যাদি শব্দ দিয়ে পানির মতন বুঝিয়ে দিতে পারতেন। লজিকই যেখানে শেষ কথা। হয়তো সেটাই ঠিক। জানে না সৈকত। শেষ কথা বলে কি আদৌ কিছু আছে?
ঘটনাটা দ্বিতীয়বার ঘটার দিন অর্থাৎ শনিবার সন্ধ্যায় আশিক কোন করে জানালো সে রাতে হলে ফিরবে না, মামার বাসায় থাকবে। সৈকত চাইলে তাড়াতাড়ি দরজা লাগিয়ে ঘুমিয়ে যেতে পারে।
সৈকত রেজাকে ফোন করল। রেজা ওর বন্ধু। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ে।
‘‘রেজা, ভাল একটা ঘুমের অষুধের নাম বলত। ফ্রেশ ঘুম দরকার। ঘুম থেকে উঠে হ্যাং ওভার থাকবে না এমন একটা অষুধ।’’
‘‘ঘুমের অষুধ লাগবে কেন? কি হয়েছে তোর?’’ রেজা উদ্বিগ্ন। ‘‘ঘুম আসে না নাকি? আমি শালা এইদিকে ঘুম ঠেকানোর অষুধ খুঁজি...।’’
‘‘নাম বলতে বলেছি, নাম বল্। ফালতু প্যাঁচাল অফ্ ...।’’
অষুধের নামটা শুনেই ফোন কেটে গেল দিল। আজ রাতে আর ঐ অবস্থার মুখোমুখি হতে চায় না সে। যে করেই হোক। তার উপর আজকে আশিকও নেই। সে একা ভাবতেই শিউরে উঠল ভয়ে হঠাৎ করে। রুমে তালা দিয়ে তক্ষুণি বেরিয়ে গেল। অষুধটা কিনতে যাবে।
রাতে বেশ আয়োজন করে ঘুমোতে গেল সৈকত। বিছানার চাদর আর পিলোকভার পাল্টালো। দাঁত ব্রাশ করে, গোসল করে ফ্রেশ হল। দুটো থ্রি মিলিগ্রাম ব্রোমাজিপাম ট্যাবলেট খেল। দুপুরের চার ঘন্টার লম্বা ঘুমটার জন্য নিজেকে গালাগাল করল। গভীর ঘুম দরকার।
কোনোভাবে শুয়েই যেন আরাম পাচ্ছে না সে। অস্থির লাগছে। অষুধের কোনো প্রভাবই অনুভব করছে না। ভেবেছিল অষুধ খেলেই ঘুম আসবে। কিন্তু স্নায়ুগুলো যেন তেতে আছে। যেন কিছু একটা ঘটবে তার প্রতীক্ষায় আছে। শরীর রিল্যাক্স করার জন্য লম্বা করে টেনে টেনে কয়েকবার দম নিল। তাতেও লাভ না হওয়ায় টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে সেদিনকার মত সেই থ্রিলারটাই চোখের সামনে মেলে ধরল। কিছুক্ষণ পরে খেয়াল করল গল্পের কাহিনীতে মন নেই ওর। বিরক্ত হয়ে রিডিং ল্যাম্পটা অফ করল। বই রেখে দিল।
মেঘ নেই আকাশে। চাঁদের আলোর খানিকটা জানালা দিয়ে এসে ওর মাথার দিকের দেয়ালে পড়েছে। সামান্য ঐ আলোটুকু ঘরের অন্ধকারে কেন খানিকটা রহস্য মিশিয়ে দিল। এই রকম অন্ধকারের একটা নাম আছে। ‘‘ঝুমঝুম অন্ধকার’’। যে অন্ধকারে শৈশবে রূপকথা শুনতে হয। অদ্ভুত কোনো মায়া আছে চাঁদের আলোতে। শুধু চোখ দিয়েই পুরোটা দেখা যায় না এই আলোতে। এলোমেলো চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।
সেদিনকার মত একই দুঃস্বপ্ন দেখল এবং একইভাবে ঘুম ভেঙে গেল। কোন এক অজানা কারণে ভয় পেল না। বিছানায় নিথর দেহটার দিকে তাকিয়েই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। ঘুমের অষুধের প্রভাবেই হয়তো মাথা ঝিমঝিম করছিল। ঘরের ভিতরের ঝুমঝুম অন্ধকারে পরাবাস্তব দৃশ্য। একই মানুষের দুটো প্রতিমূর্তি। পুরো ব্যাপারটাতে যে একটা বিশাল গন্ডগোল আছে, সেটা আর মনে হচ্ছে না তার। বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাই যেন হারিয়েছে।
ঘরের মধ্যে হেঁটে বেড়াল কিছুক্ষণ এলোমেলোভাবে। রিডিং ল্যাম্পের সুইচটা কয়েকবার অন-অফ করল। বিছানায় দেহটা তেমনি পড়ে আছে। আবার অস্থির পায়চারি। হাত দিয়ে নিজের শরীরের বিভিন্ন অংশ ধরে দেখল, চিমটি কেটে দেখল। সবকিছুই তো স্বাভাবিক। হঠাৎ পায়চারি থামিয়ে থমকে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল বিছানার দিকে। ঐতো আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে ঠিক তার মত দেখতে মানুষটা ঘুমোচ্ছে। ধীর লয়ে বুকটা উঠানামা করছে। গভীর ঘুম। চোখের মণি নড়ছে অর্থাৎ স্বপ্ন দেখছে। আচ্ছা, ঘুম থেকে জাগালে কি হবে? দু'টো সৈকত মুখোমুখি হবে?
জাগানোর চেষ্টা করল। ঘুমন্ত দেহটার কাঁধে হাত রেখে কয়েকটা ঝাঁকি দিল। লাভ হল না। মড়ার ঘুম ঘুমোচ্ছে যেন। কি ভেবে আর জাগাতে চেষ্টা করল না। টেবিলে গিয়ে রিডিং ল্যাম্প জ্বেলে একটা কাগজে লিখল, ‘‘এই লেখাটা আমি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে লিখছি। এখন রাত তিনটা বেজে সাতাশ মিনিট। আমার কি মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? কি হচ্ছে এসব?’’
লিখতে লিখতে জ্ঞান হারালো সে। পরদিন সকালে সারাঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কাগজটা পাওয়া গেল না।
চার
এই নয় দিনের মধ্যে দু'য়েকদিন বাদ দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই একই ঘটনা ঘটে চলেছে। ধীরে ধীরে সৈকত যেন অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। সেই সাথে অদ্ভুত মানসিক যন্ত্রণা। পাগল হয়ে যাচ্ছে।
আশিক হলে ফিরল সন্ধ্যে সাতটার দিকে। সৈকত তখন আশিকের কম্পিউটারে বসে গেমস খেলছিল।
‘‘সৈকত, আমি একটা জিনিস কিছুতেই বুঝি না। তুই সারাদিন ঘরের মধ্যে বন্দী থাকিস কিভাবে?’’ কোনো উত্তরের আশা না করে প্রায়ই প্রশ্নটা আশিক সৈকতকে করে। যথারীতি সৈকত কিছু বলল না। কম্পিউটার মনিটরের দিকে তাকিয়েই ঠোঁট টিপে মৃদু একটা হাসি হাসল।
‘‘চল্, চল্। ঘুরে আসি।’’
‘‘এই মাত্র না হলে ফিরলি, আবার কোথায় যাবি?’’
‘‘চল্, অন্তত নিচে গিয়ে আলমের দোকানে চা-সিগারেট হোক। পি.সি অফ কর। চল্।” তাড়া দেয় আশিক।
আলমের চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে আশিকই তুলল কথাটা। ‘‘এবার বল্ তোর কি হয়েছে? গত এক সপ্তাহ ধরে মনে হচ্ছে তুই ভিতরে ভিতরে ভীষণ অস্থির।’’
আশিকের কথা শুনে চোখ তুলে তাকালো সৈকত। ‘‘নাহ্, কী হবে? কিছু হয়নি। এমনিতেই শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।’’
‘‘গত তিন বছর ধরে আমি তোর রুমমেট। তোর নাড়িনক্ষত্র আমার জানা। আয়নায় দেখে নিস চেহারার অবস্থা। বলতে না চাইলে অবশ্য জোর করব না। বলা-না বলা তোর ব্যাপার। But I want to help.
চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগল দু’জনে। কখনও কখনও নীরবতা কথার চেয়ে বেশি অর্থপূর্ণ হয়। আশিক বুঝতে পারল, সৈকত সত্যিই ভাল নেই। খুব বড় ধরণের কোন সমস্যার মধ্যে আছে। এটাও বুঝল যে সৈকত আসলে তাকে বলতে চায় কিন্তু কোনো একটা কারনে সেটা পারছে না। অন্যদিকে সৈকত ভাবল, কাউকে যদি সে বলতে পারে তো সে একমাত্র আশিককেই। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল আশিককে সে সবকিছু খুলে বলবে।
আশিক একটা সিগারেটে আগুন ধরাতে যাচ্ছিল। সৈকত বলল, ‘‘আশিক, পুরোটা শুনলে তুই হয়তো বিশ্বাস করবি না। হয়তো ভাববি, পাগলের প্রলাপ।’’
এরপর ধীরে ধীরে সব বলল সে। আশিক চুপচাপ কোনো প্রশ্ন না করে শুনে গেল। সবশেষে বলল, ‘‘আমার মনে হয় তোর উচিত কিছুদিনের জন্য অন্য কোথাও থেকে ঘুরে আসা। You need a break. সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে বসে থাকিস। পড়ালেখা কদ্দূর কি করিস তা আল্লাহই জানে। এভাবে কি মানুষ সুস্থ থাকতে পারে?”
‘‘বলেছিলাম না, পুরোটা শুনলে তুই আমাকে পাগল ভাববি?’’ সৈকতের মুখে ম্লান হাসি।
‘‘তোর কি ধারণা আজকে রাতেও একই ঘটনা ঘটবে?’’ আশিকের সোজাসাপটা প্রশ্ন।
‘‘জানি না। গত নয়দিনে ছয়বার হয়েছে।’’
‘‘হুমম্,’’ চিনিতত এবং গম্ভীর আশিকের মুখ।
হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল সৈকত, ‘‘বাদ দে, চল রুমে যাই।’’ হাতের ছোট হয়ে আসা সিগারেটটা ফেলে পায়ে পিষে নিভায় সে। আশিকও উঠে দাঁড়ায়।
‘‘আরে, আশিক ভাই, কী খবর? আজকাল তো আপনার দেখাই পাওয়া যায় না।’’ লেভেল টু টার্ম টু এর রসি এগিয়ে এসে আশিকের সামনে দাঁড়ায়। বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকে ওঠে আশিকের। কষ্টে সৃষ্টে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘‘রসি, কেমন আছো?’’ সৈকত মুখ টিপে হাসে। রসি ছেলেটা হলের সবচেয়ে বিরক্তিকর ছেলেদের একজন। এর খপ্পরে পড়া মানে জীবন থেকে পাক্কা একটা ঘন্টা হারিয়ে যাওয়া।
‘‘বস, আপনি তো আমারে আর কোনো লেস্ন দিলেন না।’’ কণ্ঠে অভিমান রসির।
‘‘আরে মিয়া, আমারে লেসন দেয় কে? বাঁশি নিয়ে বসার সময় আছে? ফোর-ওয়ানে ওঠো। বুঝবা।” বলেই আশিক সৈকতের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘‘অই, চল্ যাই।’’ রসির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘‘রসি, পরে কথা হবে। একটু কাজ আছে। রুমে যাই।’’
‘‘চলেন, রুম পর্যন্ত যাই আপনার সাথে। আসলে আমাদেরও দম ফেরার টাইম নাই। এতাগুলো সেশনাল এই টার্মে। কী যে করি! আচ্ছা আশিক ভাই, আপনি মেশিনের অংকগুলো কেমন পারেন? আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকে না। দুইটা ক্লাশ টেস্টেই বিলো ফাইভ মার্কস।”
আশিক কিছু বলে না। চুপচাপ হাঁটতে থাকে।
‘‘বস্, এই শুক্রবার আমারে একটু টাইম দেন। জাস্ট টুয়েন্টি মিনিটস। মেশিনের কয়েকটা প্রবলেম বুঝায় দেন।’’
হঠাৎ হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে গেল আশিক। সৈকত বুঝে ফেলল কী হতে যাচ্ছে। মুখে চাপা হাসি নিয়ে সেও দাঁড়িয়ে গেল। রসি কিছু বুঝতে না পেরে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘‘কী হল বস?’’
‘‘অই, তুই ভাগ এইখান থেকে। দূরে গিয়া মর্।’’
হতবাক দাঁড়িয়ে থাকা রসিকে রেখে সৈকত আর আশিক এগোলো হলের করিডোর ধরে। পিছনে ফিরে আশিক বলে উঠল, ‘নেক্সট টাইম সামনে আসলে হাত পায়ের ইনসিওরেন্স করায় আসবি।’’
করিডোরের মোড় ঘুরে এসে হাসিতে ভেঙে পড়ল আশিক। সৈকতের মুখেও হাসি। ‘‘শালার চেহারা কি হয়েছিল দেখেছিস? কেঁদে ফেলবে যেন।’’ মনটা ভাল হয়ে যায় সৈকতের। এই ছেলেটার সাথে থাকলে কারও মন খারাপ থাকবে, হতেই পারে না।
পাঁচ
প্রায়ই সৈকতের এরকম হয়। হয়তো কোথাও বসে আছে বা দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের পরিস্থিতিটা দেখে হঠাৎ করে মনে হতে থাকে ঠিক এই পরিস্থিতিটার মধ্য দিয়ে সে আগে একবার গেছে। অথবা হঠাৎ কোনো ঘটনা দেখে মনে হয় যে ঘটনাটা আগেও ঘটেছে। আবার অনেক সময় মনে হয় ঘটনাটা যে ঘটবে সে আগে থেকেই জানত। অনভূতিটা এমন অদ্ভূত! এই ব্যাপারটাকে নাকি ‘দেজা ভু’ বলে ফরাসি ভাষায়। এর অন্য একটা অর্থও আছে। পূর্বজন্মের স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়া বা এই রকম কিছু একটা। কোনও একটা বইয়ে পড়েছিল। পড়ার পর নিশ্চিত হয়েছিল এই ভেবে যে, এরকম অনেকেরই হয়। শুধু তার একার নয়।
এই যেমন এখন সে ক্লাশে বসে আছে। মাসুদ স্যার Graph Theory পড়াচ্ছেন। পাশে বসে সাব্বির পা নাড়াতে নাড়াতে ঝিমাচ্ছে। প্রায় সবাই মন্দ্রমুগ্ধের মত লেকচার তুলছে নিজের নিজের খাতায়। একেবারে সামনের সারির বাম কোণায় বসে আছে অনন্যা। কোনাকুনি তাকালেই দেখা যাচ্ছে। বাঁ হাতের আঙুলে চুলের সরু একটা গোছা পেঁচাতে পেচাতে ঝড়ের গতিতে ক্লাশনোট তুলছে। বোর্ডে একটা ছবি আঁকা। তার নিচের বিস্তর ম্যাথেমেটিক্যাল সিম্বল ব্যবহার করে একরাশ হাবিজাবি লেখা যার বিন্দুবিসর্গ বোঝার কোন কারণ নেই। স্যার চশমার ফাঁক দিয়ে চালবাজের মত তাকিয়ে আছেন ছাত্রছাত্রীদের দিকে আর লেকচার দিচ্ছেন। ঐ তো ছোট টেবিলটার উপর রাখা বোর্ডে লেখার কালো মার্কারটা গড়াতে শুরু করেছে। স্যারের গলার শব্দ, মার্কারটার গড়িয়ে যাওয়া, অনন্যার বাঁ হাতের আঙুলে পেঁচানো চুলের গোছা, সাব্বিরের ঝিমানো- পুরো দৃশ্যটা আগেও দেখেছে বলে মনে হচ্ছে সৈকতের, হুবহু একই। গড়াতে গড়াতে মার্কারটা নিচের পড়ে গেল। শব্দ হল ঠকাস করে। ব্যস সব শেষ। পুরো ব্যাপারটা বড়জোর এক সেকেন্ডের জন্য স্থায়ী হল। স্যার মাটিতে ঝুঁকে মার্কারটা তুলে নিলেন। আবার সবকিছু স্বাভাবিক।
‘‘আমরা এখন দেখব, graph connectivity বিষয়ক Euler এর সূত্র...’’ বলতে বলতে স্যার বোর্ডের দিকে এগোলেন।
‘‘অই সৈকত, তোর মোবাইল অফ ক্যান? আশিক মেসেজ দিচ্ছে। লাঞ্চের পর ক্যাফেটেরিয়ায় থাকতে বলেছে।’’ পাশে বসা রোমেলের ফিসফিসানিতে ঘোর কাটল সৈকতের।
আশিক কয়েকদিন ধরেই সৈকতকে জোরাজুরি করছে ভাল একজন সাইক্রিয়াট্রিস্ট দেখানোর জন্য্য। সৈকত প্রথমে রাজি হয়নি। পরে আশিকের চাপাচাপিতে বাধ্য হয়েছে সায় দিতে। আশিককে সবকিছু জানানোর পর কেটে গেছে বেশ ক’টি দিন। এর মাঝে দু'টো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে।
গত পরশু দিনের আগের দিন রাতে ঘুম থেকে উঠে যথারীতি নিজের প্রতিমূর্তিটাকে ঘুমন্ত অবস্থায়ই পেল। ব্যাপারটা মোটামুটি অভ্যাসের মত লাগে ইদানিং। টয়লেটে যাওয়ার দরকার বলে পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে দরজা খুলে করিডোরে বের হল। এর পরের আর কোন স্মৃতি নেই। তারপর গতকাল রাতে যখন ঘুম ভাঙল, মনে মনে জেদ ধরল আজকে যে করেই হোক বাকি রাতটা জেগে থাকবে। দেখবে শেষ পর্যন্ত কি হয়। মোবাইলের ঘড়িতে সময় দেখল রাত তিনটে পঁচিশ। টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে একটা গল্পের বই হাতে নিয়ে পড়তে বসল। তারপর ঘুম ভাঙল সকাল আটটায় মোবাইলের অ্যালার্মের শব্দে। বিছানায উঠে বসে অনেকক্ষণ বোকার মত থ’ মেরে রইল। আশিক আগেই উঠে পড়েছে। ক্লাশে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে।
‘‘আশিক গতকাল রাতে আবার হয়েছে ব্যাপারটা,’’ ইতস্তত করে বলল, ‘‘মানে, দুঃস্বপ্নটা।” আশিক তাকে এর আগে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বুঝিয়েছে হয় গোটা ব্যাপারটাই ওর স্বপ্নের মধ্যে ঘটে অথবা জটিল কোন মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়া টাইপের কিছু একটার শিকার হয়েছে সৈকত। এবং অতি সত্বর কোন প্রফেশনাল সাহায্য নেওয়া উচিত ওর।
‘‘চল্ আজকেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিই ডক্টরের। আমি খোঁজ খবর নিয়েছি। কলাবাগানে চেম্বার। নাম ডা. আলতাফুল কাদের।’’
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ব্যাপারটা কেন যেন মেরে নিতে পারছে না সৈকত। কিন্তু যাবে না বললে আশিকের জেদটাই আরও বাড়বে। তারচে আপাতত কাটিয়ে যাওয়াই ভাল ভেবে ছোট্ট করে বলেছিল, ‘‘ঠিক আছে।’’ নিজেকে মানসিক রোগী ভাবাটা খুব কঠিন।
‘‘এই যে, পিছনে নীল টি-শার্ট, হ্যাঁ, হ্যাঁ আপনিই........’’ হঠাৎ করে বুঝতে পারল সৈকত যে স্যার তাকেই ডাকছেন। অন্যমনস্ক ছিল। প্রায় সবাই ঘুরে তাকিয়েছে ওর দিকে।
কি ব্যাপার, স্যার? আপনি কী নয়ে এতো গভীর চিন্তামগ্ন,’’ মাসুদ স্যার সুযোগ পেলে ছাড়েন না। ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ করে পেছন সারির ছেলেগুলোকে বিব্রত করা তার একটা হবি সম্ভবত। বাড়তি পাওনা হিসেবে পান সামনের সারির মেয়েগুলোর ঝকঝকে হাসি। দর্শক বিনোদনের প্রতি তাঁর প্রবল আসক্তি।
একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সৈকত। স্যারকে একটা শাস্তি দেওয়া দরকার। একেবারে নিজস্ব স্টাইলে। উঠে দাঁড়াল। স্যারের চোখের দিকে নিষ্পলক ঘুম ঘুম চোখ করে তাকিয়ে রইল। কোন জবাব দিল না। সিদ্ধান্ত নিল চোখের পলক ফেলবে না। সামনের সবাই হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছে। ওরা জানে যে সৈকত এখন প্রচন্ড নার্ভাস হয়ে পড়বে। কথা বলার জন্য খুব নাড়বে। কিন্তু আওয়াজ বেরুবে না। বড়জোর আমতা আমতা করবে। নার্ভাস ঘামতে শুরু করবে। ক্লাশে হাসির একটা ঢেউ বয়ে যাবে।
‘‘কী হল, স্যার? কথা বলতেছেন না যে?’’
সৈকত নিশ্চুপ। অদ্ভুত একটা রাগ অনুভব করতে লাগল। চোখের দৃষ্টিতে কাঠিন্য।
‘‘স্যার, শুনতে পাচ্ছেন? ‘‘স্যারের এবারের বিদ্রূপে কেউ হাসল না। সৈকত সেভাবেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বেশ কয়েক সেকেন্ড দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে রইল। অস্বাভাবিক নীরবতা। স্যার অপ্রস্তুত। সম্ভবত কি করবেন বা বলবেন বুঝতে না পেরেই চোখ সরিয়ে নিলেন। ‘‘ক্লাশে অমনোযোগী থাকা ঠিক না। বসো।’’ সৈকত বসল। স্যার আর বেশিক্ষণ পড়ালেন না, তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলেন। স্যার বের হওয়ার সাথে সাথে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে এল সৈকত। বের হবার সময় পেছন থেকে সাব্বির ডাকাডাকি করছিল। ফিরে তাকাল না সে।
মোবাইল ফোন অন করে আশিককে ফোন করল।
‘‘হ্যালো।’’
‘‘আশিক, ডাক্তারের কাছে যাবো না। আমার সমস্যার সমাধান আমি নিজেই করব।’’ একটা বেপরোয়া আত্মবিশ্বাস যেন ভর করেছে সৈকতের গলায়।
‘‘সৈকত, পাগলামী করিস না, U need help.”
কোন কথা না বলে ফোন রেখে দিল সৈকত। মানসিক রোগী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোন ইচ্ছাই তার নেই। ই.এম.ই. বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে সোজা হলের দিকে রওনা দিল। আরও দু'টো ক্লাশ ছিল পরপর। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে করবে না ও দু’টো ক্লাশ। অস্থিরতার চূড়ান্ত সীমায় যেন পৌঁছে গেছে সৈকত। চারপাশের দৃশ্য আর ঘটনাগুলো অবাস্তব মনে হতে থাকে। মনে হতে থাকে কী ভীষণ অর্থহীন সবকিছু। ঘুমিয়ে পড়ে থাকা দেহটা সত্যি, নাকি জেগে ঘুরে বেড়ান সে? এটার একটা সমাধান হওয়া দরকার। সিগারেটে আগুন ধরাবার জন্য ম্যাচের গায়ে যখন কাঠিটা দিয়ে ঘষা দিল, আগুন জ্বলে উঠা মাত্র সে বুঝে ফেলল কী করতে হবে। কি করলে সত্যিকারের নিজেকে ফিরে পাবে সে। কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
ছয়
রাত ১২:৪৫ বাজে। ঘুমোতে যাওয়ার আগে দুরু দুরু বুকে ভাবতে লাগল সে নিজের পরিকল্পনা নিয়ে। সে কি ভুল করছে? সিদ্ধান্তটা কি বেশি চূড়ান্ত ধরনের হয়ে যাচ্ছে? টানটান হয়ে থাকা স্নায়ু নিয়ে বসে আছে সৈকত। আশিক ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর কম্পিউটারে গান বেজে চলছে। লো ভলিউমে। গান ছেড়ে দিয়ে ঘুমোনো ওর ইদানিংকার অভ্যাস। শিরোনামহীনের একটা গান বাজছে।
‘‘পারবে কি ভেঙে দিতে এই দেয়াল...
পারবে কি ছিঁড়ে যেতে এই বাঁধন...
ধুলোমাখা জানালার আলো ছাড়িয়ে...
পারবে কি ফিরে যেতে আবার...”
গানটা যেন ওকে নিয়েই লেখা। রিডিং ল্যাম্পের মৃদু আলোর আলোআঁধারি ভরা ঘর। বিছানায় বিচিত্র ভঙ্গিতে শুয়ে থাকা আশিক। সামনে টেবিলে ছড়ান বইপত্র, খুলে রাখা দশ বছর আগের ডায়রির একটা পাতা। তাতে লেখা:
‘‘আজ আব্বু আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমি আর ভাইয়া বসে ছিলাম দোতলার জানালায়। মা বসার ঘরে বসে কাঁদছিল। আব্বুর হাতে একটা ব্যাগ। ঐ ব্যাগে কি আছে জানি না। হয়তো আব্বু আমাদের জন্য তার ভালবাসাটুকু ঐ ব্যাগে ভরে নিয়ে যাচ্ছেন। ভাইয়া খুব রেগে গিয়েছিল। বারবার বিড়বিড় করে বলছিল লোকটাকে খুন করতে পারলে শান্তি হয়। ঘৃণা শব্দটার অর্থ আজকে আমি বুঝেছি ভাইয়ার চোখ দু'টোর দিকে তাকিয়ে।’’
চোখের সামনের আলো আঁধারিতে ঘরের বিমূর্ত দৃশ্য মিলিয়ে গিয়ে সেই জায়গাটা জুড়ে বসল দশ বছর আগের সেই দৃশ্যগুলো।
ছোট ছিমছাম নিরিবিলি জেলা শহর। পুরনো আমলের শ্যাওলা ধরা দোতলা বাড়ি। প্রতিরাতে বাবা-মায়ের ঝগড়া। মায়ের মুখে মারের দাগ। ভাইয়ার অস্থিরতা। বাবার চরিত্র নিয়ে বাইরের মানুষের টিটকারি। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া সারাক্ষণ ঘরের মাঝে বন্দী থাকা। জানালায় বসে উড়ে যাওয়া প্লেনের দিকে তাকিয়ে নিজের ভিতরে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন তৈরি করা।
একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বর্তমানে ফিরল সৈকত। টেবিলের উপর অগোছালো বই খাতাগুলো গুছিয়ে রাখল। দু'টো ব্রোমাজিপাম ট্যাবলেট খেয়ে শুয়ে পড়ল।
দুঃস্বপ্ন। সেই সুনসান বিরান মাঠ। মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে সৈকত। এটা যে স্বপ্নের দৃশ্য, এটাও যেন কেউ তাকে বলে দিচ্ছে। আত্মবিশ্বাসহীন অসহায় মনে হচ্ছে নিজেকে। সে জানে এরপর কী হবে। তাকে তাড়া করবে সেই জন্তুটা। তাকে ছুটতে হবে আত্মরক্ষার জন্য। পুরোটুকুই আগে থেকে জানা। কী অদ্ভুত দুঃস্বপ্ন!
ঐতো এসে গেছে লোকটা। চেনা মুখ। তার বাবা। হত্যা করবে তাকে। তার দেহে শুরু হয়েছে রূপান্তর। অনেক দূর থেকে ওর দিকে এগোতে শুরু করেছে মানুষটা। আস্তে আস্তে গতি বাড়ছে। দৌড়তে শুরু করল। পা দু'টো উল্টোদিকে ভাঁজ হয়ে গেল জানোয়ারের মত। হাতদুটো শ্বাপদের মতন ব্যবহার করে এগোচ্ছে এখন। দৌড় শুরু করতে হবে এখন সৈকতকে।
মানুষের চেতনা দুঃস্বপ্নের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। কারণ ঘুমের সময় সচেতন মন নিয়ন্ত্রণ হারায়। কিন্তু স্বপ্নের মাঝেও সৈকত অনুভব করল একটা অমানুষিক ক্রোধ, রাগ। জেদ হল। পালাবে না আজকে সে। দৌড়বে না। দেখবে কী হয়।
এগিয়ে আসছে আধা মানুষ আধা জানোয়ারটা। হঠাৎ রাগ আর ক্ষোভের অনুভূতির জায়গা দখল করল শরীর বিবশ করা আতঙ্ক। একেবারে কাছে এসে পড়েছে ওটা। ঘৃণা আর ভয় নিয়ে অদ্ভুত জন্তুটার দিকে সম্মোহিতের মত তাকিয়ে রইল। অপেক্ষা করছে পরিণতির। কারণ সে জানে এটা একটা স্বপ্ন।
ঘুম ভেঙে গেল। বিছানা থেকে উঠে পড়ল। ধীরে সুস্থে স্যান্ডেল পরল। বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খেল। বিছানায় তাকিয়ে নিজের প্রতিকৃতিটা দেখল। ঘুমোচ্ছে। বন্ধ চোখের ভেতর যথারীতি চোখের মনি নড়াচড়া করছে। স্বপ্ন দেখছে। হয়তো যে স্বপ্ন থেকে সে এইমাত্র বেরিয়ে এল তার বাকিটুকু দেখছে। নিথর দেহ। মুখে একটা মৃদু যন্ত্রণার অস্পষ্ট অভিব্যক্তি।
হঠাৎ নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতন হল সৈকত। আজকেই নির্ধারিত হবে কোনটা আসল ‘আমি’। ভাবল। প্রতিবার অচেতন হয়ে পড়ে বলে শেষ দেখা হয় না। কিভাবে দু'টো দেহ-দু'টো অস্তিত্ব মিশে যায়। তাই অচেতন