Saturday, May 29, 2010

এক টুকরো শৈশব

কাঠপেন্সিল, রং, তুলি, কালার-প্যালেট আর ড্রইংখাতা ইশকুলব্যাগটাতে গুঁজে নিয়ে প্রতি বিষ্যুৎবার যেতাম ধনামনি স্যারের কাছে ছবি আঁকা শিখতে। ধনামনি চাকমা। নামটার সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই প্রিয় মুখটা। সেই চাকমা ধাঁচের মঙ্গোলিয়ান চেহারা, ছোটছোট চোখ, হলদেটে গালভর্তি লালচে ব্রন-খয়েরি ব্রনের দাগ, খাড়া খাড়া চুল, থ্যাবড়ানো নাক, হলদেটে ফর্সা গায়ের রঙ, সেই হাসি আর সেই আরাকানি টানে বাংলা কথা। ক্লাশ থ্রি বা ফোরে পড়ি তখন। আমার মতনই আর সবাই খাতা রঙ সবকিছু মেলে মাটিতে বসে যেতো স্যারকে ঘিরে। চারদিকে ছড়ানো ছিটানো থাকতো 2B 4B 6B পেন্সিল, প্যাস্টেক কালারের প্যাকেট, পান্ডা মার্কা জলরং, রঙের প্যালেট আরও অনেক অনেক কিছু।এখন এটা যেন আমার স্বপ্নের একটা টুকরো দৃশ্য যেন। খুব সজীব শেডের কিছু রঙ্গে রঙ্গিন একটা দৃশ্য। স্মৃতির এলবামে একটা স্টিল ফটোগ্রাফ।
কখনোই সেরকম ডানপিটে ছিলাম না আমি। স্যারকে ভালো লাগত খুব। সরল একটা মানুষ। আঁকা খারাপ হলে সরল মনেই সেটাকে খারাপ বলে ফেলতেন। মন দিয়ে স্যারের এঁকে দেয়া ছবি দেখে দেখে আঁকতাম। জলরং করতাম খুব সাবধানে। স্যার সামনে বসে রঙ করা দেখতে থাকলে আমার নার্ভাস তুলি ধরা হাত কাঁপত। দেখে হেসে ফেলত মানুষটা। সেই হাসিটা আরেকটা স্টিল ফটোগ্রাফ।
এভাবে শিখতে শিখতে হঠাৎ খেয়াল করলাম বেশ কিছু প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জুটে গেছে আমার। কয়েকটা কাঁচা হাতের জলরং-এ আঁকা ছবি বাঁধানো অবস্থায় আমাদের ছোট বাসার ড্রইংরুমে ঝুলে থাকত। গেস্টদের কাউকে কাউকে সেগুলো দেখিয়ে আব্বু আম্মু গর্ব করলে আমি লজ্জা পেতাম, কারণ আদতে ওগুলো কোন ভালো ছবিই ছিলো না। ইশকুলেও ততদিনে ড্রইং-এ ভালো মার্কস পেতে শুরু করেছি। যে কোন ছবি দেখে দেখে সেটা এঁকে ফেলার একটা সাধারণ দক্ষতা কিভাবে যেন ধনামনি স্যারের হাত ধরে পেয়ে গেলাম নিজের মাঝে।
ইশকুলের নাম ছিল হারম্যান মেইনার স্কুল ও কলেজ। বিরাট জায়গা জুড়ে লাল ইটের ইংরেজি ‘এইচ’ অক্ষরের মতন দোতলা দালান। বেশ বড় একটা সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ। একটা বাস্কেটবল গ্রাউন্ড। অডিটোরিয়াম। পিছনে ছোট ক্লাশের ছেলেমেয়েদের জন্য স্লিপার, সী-স আর দোলনা। প্রতিদিন সকাল আটটায় বসত এসেম্‌ব্লি। কোরান তেলাওয়াত-তর্জমা, জাতীয় সংগীত, প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডামের ভাষণ ইত্যাদি। সব শেষ হলে ক্লাশ অনুসারে সবার ক্লাশরুম নামের বাক্সটার দিকে লাইন ধরে রওনা হওয়া। কড়া নিয়ম-কানুন।
বিশেষ একটা দিনের কথা বলতে এত বর্ণনা। মনে আছে গরমকাল ছিল তখন। সকাল আটটার রোদেই তাই ভীষণ তেজ। লাইন ধরে এসেম্‌ব্লিতে দাঁড়িয়ে আছি। পূব্দিকে মুখ করে দাঁড়াতাম আমরা সারি বেঁধে। রোদের তেজে সামনের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। অথচ জাতীয় সংগীতের সময় আবার নিচের দিকে তাকানোর নিয়ম নেই।
পূবদিকে সোজা তাকানো যাচ্ছিল না রোদ্দুরের তেজে। ততক্ষণে সবাই সবার সাথে গলা মিলিয়ে জাতীয় সংগীত গাইছি। “ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে কী দেখেছি ...”। ঠিক সেই মুহূর্তে পোকাটা মাথায় ঢুকল। আমার কী হল আমি জানি না। অদ্ভুত একটা জেদ মাথায় চেপে বসল। মনে হতে থাকল কেন আমি সূর্যের দিকে তাকাতে পারছি না, কেন আমার চোখজোড়া রোদ্দুরের তেজ সহ্য করতে পারছি না। বারবার চেষ্টা করেও সামনের দিকে তাকাতে পারলাম না। চোখে বারবার পানি চলে আসে। বারকয়েক চেশটার পর খুব অভিমানি হয়ে উঠেছিল সেদিন আমার ছেলেমানুষী জেদটা। কেন সূর্যটার শক্তি আমার চোখের চেয়ে বেশি- অসহায়, অর্থহীন আর শিশুসুলভ কয়েক ফোঁটা চোখের পানি কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতাসে উবে যায়। অভিমানের কয়েক ফোঁটা চোখের পানি হারিয়ে যায়। ভাগ্য ভালো কেউ দেখেনি সেটা সেদিন।

(অসম্পূর্ণ। হয়তো চলবে)

2 comments:

বোহেমিয়ান said...

চমৎকার লাগছিলো ।
চলুক

আপনি আঁকাআঁকিতে ভালো ছিলেন , আমি একমাত্র এইটাতেই সি পাইতাম :(

Tanvir said...

tomar blog dekte gea ... Dhonomoni Sir r kotha mone pore gelo... unar kono contact no ache?