Saturday, May 29, 2010

গল্পের ক্রাইসিস ও ক্লাইম্যাক্স

রাশেদ
একটা গল্পের প্লট বেশ কয়েকদিন হলো মাথায় নিয়ে ঘুরছে রাশেদ। সে গল্পকার বা লেখক নয়। লেখালেখির তেমন কোনো শখ বা খেয়ালও তার আগে কখনোই ছিল না। তবে একদিন এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় একটা শপিং সেন্টারে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে প্রথমবার তার একটা গল্প লেখার ইচ্ছে হলো। অভ্যেস নেই বলে প্রথম প্রথম কাগজ কলম নিয়ে বসে তেমন একটা লাভ হয়নি; সুকুমার রায়ের আঁকা অদ্ভূতুড়ে দেখতে প্রাণীগুলোর মতন কিছু জন্তুজানোয়ার আঁকা ছাড়া। লিখতে বসে আবার কয়েকবার এটাও মনে হয়েছে যে সে তো জীবনে কখনোই লেখক হতে চায়নি। সত্যি বলতে কি জীবনে কখনোই নির্দিষ্টভাবে কোনকিছু সে হতে চেয়েছে বলেও তার মনে পড়ে না। তাই ভাবতে থাকে কেন সে লিখবে? অবশ্য বই পড়ার একটা বাতিক তার আছে। ইশকুল জীবনে মাসুদ রানা পড়ার অভ্যেসটা সিডনি শেলডন, স্টিফেন কিং, রবার্ট লুডলাম, রবিন কুক আর হালের ড্যান ব্রাউন-মানে থ্রিলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছিল। বাংলাতেও তাই শরদিন্দু, সত্যজিৎ বা হুমায়ূন আহমেদের মতন খুব জনপ্রিয় লেখকের লেখা ছাড়া পড়া হয়নি। থ্রিলার বা রোমান্টিক উপন্যাসের ছোটখাটো সংগ্রহও গড়ে উঠেছিল যেটা বন্ধু-বান্ধবের পাঠাভ্যাসের কল্যাণে বহু আগেই বিলুপ্তপ্রায়। তাই মনে হয় যে মানুষকে জানাবার মতন তেমন কোনো জ্ঞানের কথা তার নেই যে সে লিখবে। আর এমন সাদামাটা একটা জীবন তার যে লেখার মতন অভিজ্ঞতাও তার খুব একটা নেই। লেখালেখি করবে শিল্পের সাধক টাইপের লোকজন বা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ধরণের জ্ঞানী মানুষেরা। সে তো কোনো দলেই পড়ে না।

রাশেদ একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করে। বেশ ভালো অংকের বেতন পায়। ঝামেলাবিহীন জীবন। পাশ করে একদিনের জন্যেও বেকার থাকতে হয়নি। তেমন বড় কোন উচ্চাশা নেই জীবনে। দেখতে সরল হলেও বোকা নয় সে। তার প্রমাণ কাজেকর্মে এই একটি বছরের মধ্যেই অফিসে সে নিজের যথেষ্ঠ দক্ষতা দেখাতে পেরেছে।

গল্প লেখার ইচ্ছেটা হয়েছিল সেদিন সন্ধ্যেয় দুটো মানুষকে দেখে। তাদের পাশে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে। ঐ মানুষ দুজনও তার মতনই বৃষ্টির জন্য আটকা পড়েছিল। ঝলমলে বিশাল বসুন্ধরা সিটি শপিং সেন্টারের এক্সিটে দাঁড়ানো অনেকগুলো মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল তারা তিনজন। মানুষ দুজন সমবয়সীই হবে। একজোড়া যুবক-যুবতী ওরা। আটাশ-ঊনত্রিশ হবে বয়স। দুজন দুজনাতে ভীষণ মগ্ন। এমনভাবে কথা বলছিল তারা আশেপাশে যে আরও মানুষ আছে সেটা নিয়ে যেন দুজনেই তোয়াক্কা করে না। কেউ কিছু শুনলে যেন কিছু আসে যায় না তাদের। অথচ রাশেদ মোটামুটি নিশ্চিত ব্যাপারটা এমন হওয়ার কথা নয় মোটেও। কারণ ওদের এতক্ষণের আলাপ শুনে সে যেটা বুঝেছে তা হল মেয়েটা বিবাহিতা। স্বামী সম্ভবত আর্মির ক্যাপ্টেন বা মেজর গোছের কিছু একটা হবে। মেয়েটাকে ডাকা হচ্ছিল নায়লা বলে। আর যুবকটির নাম প্রতীক অথবা পথিক। নায়লা নামের মেয়েটার আহ্লাদি ধরনের উচ্চারণের জন্যে নিশ্চিত হতে পারছিল না। পরে মনে হল নামটা পথিকই হবে।

রাশেদ আগাগোড়া ভদ্রলোক ধরনের মানুষ। ছোটবেলা থেকেই। নিজের অজান্তেই সবসময় সে অতিরিক্ত ভদ্র। তাই পাশে দাঁড়ানো পরকীয়া প্রেমেমত্ত প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তরঙ্গ আলাপ আড়ি পেতে শোনার জন্যে খানিকটা গ্লানি সে অনুভব করছিল। সবচেয়ে নিপাট সাধুর মাথায়ও খানিকটা বদ খেয়াল চাপতে পারে। তাই তার অপরাধ ততটা গুরুতর বলা যায় না। তাছাড়া সময়টাও বেশ কেটে যাচ্ছিল কথার পিঠে কথার খেলা শুনতে শুনতে।

ছেলে আর মেয়েটা খুব সম্ভবত একই ইউনিভার্সিটির একই ডিপার্টমেন্ট থেকে পাশ করেছিল। প্রেমের সম্পর্কটা তাই নতুন নয়। হয়তো বিয়েও হওয়ার কথা ছিল। সম্ভবত বাস্তবতা নামের স্বেচ্ছাচারী ক্ষুদে ঈশ্বরের গোয়ার্তুমিতে বিয়েটা হয়নি। রাশেদ খানিকটা যেন কল্পনায় মেতে ওঠে অচেনা মানুষ দুজনের ফেলে আসা ঘর-বাঁধার-স্বপ্ন-গড়া-ভাঙ্গার দিনগুলো নিয়ে। হয়তো মেয়েটার বাবা-মা জোর করে অন্য লোকের সাথে বিয়েতে বাধ্য করেছিলো; হতে পারে পথিক নামের ছেলেটা তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে।

“ডিভোর্স এতো সহজ ব্যাপার না, বোকা কোথাকার।” মেয়েটা বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল। “আর তাছাড়া আর্মি অফিসারদের ইগো বোঝো? এটা ওদের ক্যারিয়ারের জন্য ভীষণ একটা নেগেটিভ। ঘরের বউ সামলাতে পারে না, এমন অফিসার সাবোর্ডিনেটদের কিভাবে সামলাবে-এই টাইপ ব্যাপার। বুঝলা?” একটু থেমে চোখমুখ শক্ত করে মেয়েটা বলে ওঠে, “ও আমাকে এতো সহজে ছাড়বে না, আমি জানি।” রাশেদের পরিপাটি ভদ্র চোরাচাহনি ততক্ষণে জরীপ করে নিয়েছে নায়লাকে। কিছু কিছু মেয়েকে দেখলেই বিজ্ঞাপনের মডেল মনে হয়। এরা পোশাকের নতুন ফ্যাশন, হেয়ারস্টাইল ইত্যাদি রাশেদের আরো অনেক অজানা ব্যাপার নিখুঁতভাবে মেনে চলে। নায়লাকে সেরকমই একজন মনে হলো। চুলে ব্রাউন রঙ করা। লম্বা এবং বলতে নেই বেশ আকর্ষণীয় ফিগার। গায়ের রঙ ফর্সা আর শ্যামলার মাঝামাঝি। মোটকথা, হতভাগা আর্মি পার্সনটির বউখানা একজন অতি সুন্দরী যুবতী; ‘যৌনাবেদনময়ী’ শব্দটা চট করে মনে আসার মতন।

পথিক নামের যুবকটি সেই তুলনায় এক্কেবারে সাদামাটা। মাঝারি উচ্চতা। বিশেষত্বহীন চেহারা। তবে বেশ পরিপাটি। নায়লার কথা শুনে পথিকের চোয়াল শক্ত হতে দেখলো রাশেদ। চেহারায় রাগ। গজগজ করে বলল, “তো এখন আমরা কী করব? কলেজ পালানো ছেলেমেয়েদের মত লুকিয়ে চুরিয়ে জাঙ্কফুডের দোকানে বসে বসে প্রেমের খেলা কন্টিনিউ করব? এটাই তোমার ইচ্ছা! স্টুপিড!” একটা শব্দও রাশেদের কান এড়ালো না।

যেকোন কারণেই হোক, প্রেম জিনিসটা কখনো করা হয়ে ওঠেনি রাশেদের। সে নিজেও ভেবেছে ব্যাপারটা নিয়ে। ইউনিভার্সিটি থেকে বের হবার পর এই এক বছরের মধ্যেই ওর অনেক বন্ধুবান্ধব বিয়ে করে ফেলেছে। বিশেষ করে ক্লাশে যে ‘জুটি’গুলো ছিলো, তারা তো অনেক আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। পথেঘাটে সুন্দর দেখতে মেয়েগুলোর দিকে প্রায়ই থমকে তাকিয়ে থাকে সে। এদের কাউকে কাউকে প্রেমিকা বা বউ হিসেবে কল্পনা করার চেষ্টা করে।

অফিস থেকে ফিরে যখন বাসায় কোন কাজ থাকে না, টিভির রিমোট কন্ট্রোল টিপতে টিপতে অলস সময় কাটায় সে মাঝে মাঝে। অসংখ্য চ্যানেলে অসংখ্য নাটক আর সিরিয়াল। সেখানে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কগুলো কতরকম জটিলতার মধ্যে দিয়ে যেতে পারে সেগুলো দেখানো হয়। সেগুলো দেখে দেখে একা একা ঝামেলাবিহীন জীবন যে খারাপ নয় সেটা ভালোই বুঝতে পারে সে। নিজের খেয়ালখুশিতে চলতে পারার একটা সহজ আনন্দ আছে। সেটা হারানোর কোনো মানে হয় না। তবু মাঝে মাঝে বিপরীত রাস্তায় রিকশাতে অন্তরঙ্গভাবে বসে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেখলে অথবা কোন উৎসবে তাদের উল্লাস দেখলে তারও আফসোস হয়। একেবারে নিজের একটা মানুষের সে অভাব অনুভব করে। মানুষের জীবনে বড় ধরনের সমস্যা না থাকলে যা হয়।

ইউনিভার্সিটিতে বা কর্মক্ষেত্রে নানাভাবে মেয়েদের সংস্পর্শে আসতে হয়েছে তাকে। কিন্তু কোথাও কখনো সেভাবে কোন নির্দিষ্ট কারো প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেনি সে। বন্ধুদের অনেককে দেখেছে ‘টাইম পাসে’র জন্য যেমনতেমনভাবে পরিচিত মেয়েদের সাথে ঘোরাঘুরি করতে। এদের পরিচয়ের উৎস বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট অথবা বন্ধুর বন্ধু অথবা বন্ধুর বন্ধুর বন্ধু-এভাবে। সেরকম কোন সম্পর্কের ইচ্ছেও হয়নি তার। তবে বন্ধুদের আদিরসাত্মক গল্পগুলো শুনতে মন্দ লাগেতো না তার।

তবু ঐদিন পথিক এবং নায়লার কথোপকথন শুনে রাশেদের মাথায় নরনারীর সম্পর্ক বিষয়টাতে নতুন একটা ব্যাপার যোগ হল। পরকীয়া। নাটক গল্প উপন্যাসে অনেকবার পেয়েছে সে এই ব্যাপারটা। কিন্তু চোখের সামনে ওদের দেখে বিষয়টা মাথায় বেশ জায়গা করে নিল। বৃষ্টি কমে আসার পর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো সবাই যে যার পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। রাশেদও সিএনজি খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ততক্ষণে পথিক আর নায়লা হারিয়ে গেছে ভীড়ের মাঝে। আর রাশেদের মাথার মধ্যে রেখে গেছে একটা গল্পের প্লট আর গল্প লেখার ইচ্ছেটা।



তৌফিক
“কী হলো? এখনও রেডি হওনি তুমি!” নায়লার দেরি দেখে বিরক্ত হলো তৌফিক। “এতক্ষণে সবাই হয়তো পৌঁছে গেছেন। প্লিজ একটু তাড়াতাড়ি কর।” বলতে বলতে মেজর তৌফিক বেডরুম থেকে ব্যালকনিতে এসে একটা সিগারেট ধরায়। নায়লা মাঝে মাঝে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বুঝতে চায় না, ক্যারিয়ারের জন্য একজন সামরিক কর্মকর্তার জীবনে সময়ানুবর্তি হওয়া কতটা জরুরি। তৌফিকের মনে হয় যে নায়লা এটা ইচ্ছা করেই করে। তাকে রাগিয়ে দিয়ে মজা পায়।

নায়লা আরো সময় নেয়। ক্যান্টনমেন্টের জীবনে একজন মেজরের দায়িত্বশীল স্ত্রী হিসেবে মানিয়ে নিতে পারেনি বলে নয়। কেউ কিছু চাপিয়ে দিলে সহ্য হয় না ওর। খুব ধীরে ধীরে কানের দুলজোড়া পরে সে। বিউটি পার্লারে ঘন্টাকতক কাটিয়ে আসার পরও তাই সময় লাগে। “এই তো, আর পাঁচ মিনিট। এতো অস্থির হও কেন?” বেডরুম থেকে নায়লার কন্ঠ ভেসে আসে।

ঘনঘন সিগারেটে টান দ্যায় তৌফিক। কিছুক্ষণ পরে আধখাওয়া সিগারেটটা গুঁজে দ্যায় ব্যালকনিতে রাখা টি-টেবিলের অ্যাশট্রেতে। নায়লাকে ইচ্ছে করে সন্ধ্যে সাতটার বদলে সাড়ে ছয়টার কথা বলেছিলো সে। তাও এখন প্রায় সাতটা বাজতে চলেছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাত আবার চলে যায় সিগারেটের প্যাকেটের দিকে। লাইটার দিয়ে ঠোঁটে ঝোলানো সিগারেটটা ধরাতে যাবে, এমন সময় নায়লার গলা শোনা গেলো। “অ্যাই, এদিকে এসো তো একটু।”

কালো জর্জেটের আঁচলটা বাঁ হাতে মেলে ধরে মোহনীয় ভঙ্গিতে তৌফিকের সামনে নিজেকে মেলে ধরল নায়লা। ডানহাত কোমরে। ঠোঁটে হাসি। “কেমন লাগছে আমাকে বলো।”

তৌফিক সাজসজ্জার দিকে না তাকিয়ে সোজা নায়লার চোখের দিকে তাকায়। অস্বস্তির সাথে চোখ সরিয়েও নেয়। নিজের স্ত্রীর আত্মবিশ্বাস দেখে অবাক হয় মেজর তৌফিক। বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ নেই নায়লার চোখে।

তৌফিক জানে কাজটা অপরাধের মধ্যে পড়ে। কিন্তু সেদিন নায়লার মোবাইলের এসএমএস ইনবক্স না ঘাটলে তো এখনও সে জানতে পারত না তার স্ত্রী অনৈতিকভাবে পরপুরুষের সাথে একটা সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। তৌফিকের এখনো বিশ্বাস হয় না। আবার বিশ্বাস না করেও সে পারে না। নায়লাকে সরাসরি কিছু বলবে কিনা ভেবেছে এর মধ্যে বেশ কয়েকবার।



নায়লা
পুরুষের চোখে মুগ্ধতা দেখে দেখে ব্যাপারটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে নায়লা। আগের মতন তাই মুগ্ধ চোখগুলো তাকে শিহরিত করে না। প্রতি একশো পুরুষের একশোজনের চোখে সে নিজেকে আয়নার মতন দেখে নিতে পারে। দেখে দেখে আরো আত্মবিশ্বাস পায়। মুগ্ধতার সাথে সাথে কিছু পুরুষের চোখে যখন তীব্র কামনা জেগে উঠতে দ্যাখে, তখন এক ধরনের কৌতুক অনুভব করে সে। পুরুষগুলো এমন হ্যাংলা হয়! এই তো যেমন সেদিন পথিকের সাথে শপিং শেষে বসুন্ধরা সিটির নীচে পথিকের সাথে ঝগড়া করতে করতে হঠাৎ তার মনে হলো কেউ তাকে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। আড়চোখে তাকাতে খেয়াল করল একটা ছেলে তাকে বেশ কৌতূহল নিয়ে দেখছে। অভদ্রের মতন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে আবার পথিকের দিকেও তাকাচ্ছে। ছেলেটার বয়স পঁচিশের বেশি হবে না। সহজসরল চেহারা। পথিকের দিকেও তাকাচ্ছে মাঝে মাঝে। আড়ি পেতে ওদের কথা শুনছিল না তো? শুনুকগে। আমল দিলো না আর ছেলেটাকে। তৌফিকের সাথে পার্টিতে গেলেও সেই একই অভিব্যক্তির ছড়াছড়ি। মাঝে মাঝে ভীষণ একঘেয়ে লাগে তার।

এই যেমন আজকেও যেতে হবে একটা পার্টিতে। তৌফিকের তাড়াহুড়ো দেখেও সে আস্তে আস্তে তৈরি হয়। তার নিজের কোন তাড়া নেই। ক্যান্টনমেন্টের এসব সামাজিকতা তার ইদানিং অসহনীয় লাগে। কতগুলো শ্যভিনিস্ট তাদের ব্যক্তিত্বহীন বউগুলোকে নিয়ে সেখানে হাজির হয় আর নানাপদের সেন্স অভ হিউমার দেখাতে থাকে। ভাবীরাও এমনসব বিষয় নিয়ে গল্পে মেতে অঠে যেগুলোতে তার কোন কৌতূহল নেই।

মাঝে মাঝে মনে হয় বিয়ে করা আর আত্মা বিক্রি করা একই কথা। এই যে তার নিজের কোন ক্যারিয়ার গড়ে উঠল না, স্বেচ্ছাস্বাধীনভাবে চলাফেরাতে পদে পদে কৈফিয়ত আর কৈফিয়ত- বিয়ের জন্যই তো এই দমবন্ধ করা জ়ীবন তার।




পথিক
মোটরসাইকেলটার স্পীড ঠিকমতন উঠছে না। সাত-সকালে অফিসে যাওয়ার সময়ই বিরক্তির মুখোমুখি হলো পথিক। এমনিতেই রাতে ঘুম হয়নি ভালো। নায়লার সাথে মোবাইলে কথা শেষ হতে হতে রাত দু’টো বেজেছিল। ঘন্টাখানিক ধরে অহেতুক কথা কাটাকাটি করে ঘুম চলে গিয়েছিলো। ঘুমোবার জন্য একটা ডরমিকাম খেয়ে শুয়েছিলো। তার পরেও ঘুমানোর আগে শেষবার বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনটাতে সময় দেখেছিলো তিনটে দশ। অর্থাৎ কমসে কম সাড়ে তিনটা বেজেছে ঘুমাতে। পথিক জানে রাতে কম ঘুম হলে তার জের টানতে হয় সারাদিন। তার উপর সিডেটিভ খাওয়ার প্রভাব তো রয়েছেই। অথচ আজকে অফিসে খুব ব্যস্ত একটা দিন যাওয়ার কথা তার।

মোটরসাইকেলটা ওর একটা বিশ্বস্ত সঙ্গী। বন্ধুর মতন। কেনার পর থেকে খুব ভালো সার্ভিস দিচ্ছে। সহজে গড়বড় করে না। আজকে কী হলো কে জানে! বেশ কয়েকবার বেপরোয়া পিক্‌আপ তুলেও যখন দেখলো ঠিকমতন গতি উঠছে না, সিদ্ধান্তে পৌঁছলো ক্লাচপ্লেটে সমস্যা। বদলাতে হবে মনে হয় ক্লাচপ্লেটটা। একেবারে সার্ভিসিং-এ দেবে বলেই ঠিক করলো।

ঢিমেতালের গতিতে অফিসের দিকে যেতে যেতে গতকাল রাতে নায়লার সাথে মোবাইলে কথা কাটাকাটির কথা ভাবতে লাগলো সে। সেদিন সন্ধ্যায় ওরা দেখা করেছিলো বসুন্ধরা সিটিতে। নায়লাই শপিং-এ এসে ওকে ফোন করেছিলো। অফিস থেকে সোজা ও চলে এসেছিলো শপিং সেন্টারে। নায়লা কিছু টুকটাক কেনাকাটা করলো। একসাথে সময় কাটানোর জন্যে ঘুরতে ঘুরতে বেশ কিছু ডিভিডি কিনলো পথিক। জানে একটা মুভিও দেখার সময় পাবে না। বেরবার সময় শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টি থামবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ই আসলে গোলমালটা শুরু হয়েছিলো। ডিভোর্সের কথা তোলায় এইভাবে নায়লা প্রায় সিন-ক্রিয়েট করবে আগে ভাবেনি পথিক। নায়লার উপরে যেমন রাগ উঠলো, নিজের উপরও উঠলো। নইলে একসাথে শপিং-এর সময়টা খুব ভালো কেটেছিলো ওদের। গতরাতের ঝগড়ার কারণও ছিলো একই।

পথিক নিশ্চিত যে ডিভোর্সের ঝামেলার মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে নায়লা। অথচ এদিকে পথিক নিজে বাসায় তার বাবা-মাকে প্রায় রাজি করিয়ে ফেলেছে একটা ডিভোর্সি মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেওয়ার ব্যাপারে। কে জানে কত ঝামেলা পোহাতে হবে সামনে। ঐ ব্যাটা আর্মি মেজরও তো ঝামেলা কম করবে না। এসব ভাবতে ভাবতে অফিসে পৌঁছে গেলো পথিক।

পথিকের অফিসটা বনানিতে। বেশ নামকরা একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। ওর কাজ মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে। মোটরসাইকেল বেসমেন্টে পার্ক করে চাবির রিংটা আঙ্গুলে ঘোরাতে ঘোরাতে গ্রাউন্ড ফ্লোরের লিফটের দিকে এগোল সে। কিন্তু লিফটের সামনের লাইনে দেখা হয়ে গেলো সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার জুনায়েদ সিদ্দিকি অর্থাৎ ওর ইমিডিয়েট বসের সাথে। ভাগ্যটাকে গালাগাল করা ছাড়া আর কিছু করার নেই; কারণ জুনায়েদ ভাই তাকে দেখে ফেলেছেন।

“স্লামালেকুম, জুনায়েদ ভাই। কেমন আছেন?”
“ওয়ালাইকুম সালাম। এই তো আছি ভালোই। আমাকে খারাপ থাকতে দেখেছো কখনো? খারাপ থাকাথাকির মধ্যে আমি নেই। তুমি কেমন আছো বলো। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে তো?” কথা বেশি বলে লোকটা। এমনিতে মানুষ খারাপ না।
“জি, এইতো, ভালোই চলছে...”

তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ লাইনে দাঁড়ানো দুজন। লম্বা লাইন। হঠাৎ জুনায়েদ পিছন ফিরে পথিককে জিজ্ঞেস করে, “কী ব্যাপার, পথিক, আপনার শরীর খারাপ নাকি?”

“না তো। কেন ভাইয়া, দেখে তাই মনে হচ্ছে নাকি?”
“হুম্‌ম। শরীরের দিকে খেয়াল রাখবা, বুঝলা? এক কাজ কর, বিয়েটিয়ে করে ফেলো। গার্লফ্রেন্ড আছে না? তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলো। নাইলে দেখবা রেগুলার ঝগড়াঝাটি করে মেজাজ খারাপ করে অফিসে আসতেছো। কাজে মন বসতেছে না। হা হা হা।” জুনায়েদ তার জুনিয়রদের সাথে বেশ বন্ধুসুলভ আচরণ করার চেষ্টা করে, যেটা বেশিরভাগ সময়ই অপরপক্ষের জন্য বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। এটা নিয়ে অবশ্য তার কোন মাথাব্যাথা আছে বলে মনে হয় না। ওদের অফিস চৌদ্দ তলায়। সবকিছুরই শেষ আছে। জুনায়েদ ভাইয়ের সাথে লিফটে চৌদ্দ তলায় এসে নিজের ডেস্কে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পথিক।

কম্পিউটারটা অন করে উঠে গিয়ে এক মগ কফি বানিয়ে নিয়ে এসে কাজে বসল। বারোটার মধ্যেই একটা প্রেজেন্টেশন রেডি করতে হবে। সময় কম। রাতজাগা ক্লান্তির কিছুটা দূর হলো কফির মগে চুমুক দিয়ে। তবু কিছুটা ক্লান্তি রয়েই গেলো। প্রেজেন্টেশনের ম্যাটেরিয়ালগুলো বেশির ভাগই গতকাল ইন্টারনেট থেকে যোগাড় করে রেখেছিল বলে রক্ষা। এখন শুধু স্লাইডগুলো সাজাতে হবে। আশা করল বারোটার মিটিং-এর অনেক আগেই শেষ হয়ে যাবে কাজটা। কিছুক্ষণের মধ্যে কাজের মধ্যে ডুবে গেলো সে। প্রেজেন্টেশন্টা ভালো হওয়া খুব জরুরি। জি. এম. মার্কেটিং লোকটা পথিকের ভাষায় একটা আস্ত খাটাশ। খুব খুঁতখুঁতে। ছোটখাটো ফাঁক পেলেই হলো। এমন একটা মন্তব্য করে বসবে যা হজমও করা যাবে না আবার সহ্যও করা যাবে না। আশার কথা হলো লান্‌চ আওয়ারের অল্প সময় আগে মিটিংটা। খুব লম্বা হওয়ার কথা না।

প্রেজেন্টেশন স্লাইডগুলো এডিট করতে করতে ছোট্ট একটা তথ্যে চোখ আটকে গেলো পথিকের। তথ্যটির পাশে বুদ্ধি করে সেটার রেফারেন্স হিসাবে ওয়েবসাইটের ঠিকানা রেখেছিলো বলে নিজের উপর খুশি হয়ে উঠলো। ওয়েবসাইটটা ব্রাউজারে খুলে পড়তে শুরু করলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে নিজের অজান্তে উত্তেজনায় চেয়ারে মেরুদণ্ড সোজা করে বসলো। তারপর কিছুক্ষণ চললো বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ওড়াউড়ি। অবশেষে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটলো পথিকের। হাসিটা ঝুলে রইলো অনেকক্ষণ। কাজ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে এইমাত্র পাওয়া ইনফরমেশনগুলো সাজাতে লাগল মনে মনে। ধীরে ধীরে একটা পরিকল্পনা গড়ে তুললো। কোথাও ফাঁক নেই এমন একটা পরিকল্পনা।

আজকের মিটিংটা একটা বিশেষ ধরনের এন্টিহিস্টামিন জাতীয় অষুধের উপর। এলার্জি বা সাধারণ সর্দি-কাশিতে ব্যবহৃত হয় এমন। তথ্যগুলো সেটারই একটা উপাদান নিয়ে। এমনিতে সেটা নিরীহ। কিন্তু নিকোটিনের সাথে মিশিয়ে সেটা বেশিমাত্রায় গ্রহণ করলে মৃত্যু নিশ্চিত অর্থাৎ সহজভাবে বলতে গেলে সাধারণ সর্দি-কাশির অষুধের একটা উপাদান আর নিকোটিন একসাথে মিলে একটা কার্‌যকর নিউরোটিক বিষ। টক্সিকোলজির একটা অনলাইন জার্নালে খুব সাধারণভাবে লেখা কথাটাই চিন্তার ঝড় তুলেছে পথিকের মধ্যে। শুধু তা-ই নয়। এই বিষে মৃত্যু হলে পনেরো থেকে বিশ মিনিটের মধ্যেই মৃতদেহের রক্ত বা ফুসফুসের আলামত থেকে বিষ সনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। মৃত্যুর কারণ মনে হবে সাধারণ কার্ডিও-মাইয়প্যাথি বা সহজ বাংলায় হার্ট অ্যাটাক। ফরেন্সিক স্পেশালিস্টদের একটা ফোরামে এই ধরণের বিষ সনাক্তকরণ নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা পাওয়া গেলো যার সারমর্ম দাঁড়ালো, যে ধরণের স্পেক্‌ট্রোগ্রাফ গ্যাস অ্যানালাইজার এই শ্রেণীর বিষ মৃতদেহের নানান আলামত থেকে সনাক্ত করতে পারে, সে ধরণের প্রযুক্তি উন্নত বিশ্বের কিছু দেশের বাইরে কোথাও ব্যবহৃত হয় না বললেই চলে।

চোখেমুখে এই আবিষ্কারের আনন্দ থাকায় মিটিং-এ চমৎকার সপ্রতিভ মনে হলো পথিককে। জি. এম. মার্কেটিং-কে দেখে বোঝা গেলো ভদ্রলোক সন্তুষ্ট।

পথিকের এতোটা খুশি হওয়ার কারণ আর কিছুই নয়। মিটিং থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে প্রোডাক্ট হিসেবে ঐ বিশেষ এন্টিহিস্টামিনের বাজারজাতকরণের প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি ভুল হয়নি এবং সৌভাগ্যক্রমে নায়লার স্বামী একজন স্মোকার। সকালের বিরক্তি বা মেজাজ খারাপের লেশমাত্র আর রইল না পথিকের জ্বলজ্বলে চোখজোড়ায়; একটা চমৎকার খুনের পরিকল্পনা করতে পেরে।

রাশেদ
ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটে চলাচল দিনকে দিন আরো বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। অফিসের ‘পিক অ্যান্ড ড্রপ’ সার্ভিস মিস করলে তাই যাতায়াতটা অসহনীয় হয়ে পড়ে। রাশেদের বাসা শ্যামলির শেখেরটেকে। এমনিতে শেখেরটেক থেকে গুলশান যাওয়াটা আগে যতটা ঝামেলার ছিল এখন ততটা নেই। অনেকরকম বাস সার্ভিস চালু হয়েছে বছরখানেক হলো। বড় বড় সিএনজি চালিত বাস। বিশাল শব্দ তুলে রাস্তায় সেগুলো শ্লথগতিতে চলে। অনেক সময় নষ্ট হয় সেগুলোতে উঠলে।

রাশেদ আজকেও অফিসের গাড়ি মিস করেছে। বাসে উঠবে না। ঘামের দুর্গন্ধ সহ্য হয় না বাসের ভীড়ে তার। একটা ট্যাক্সি পেলে ভালো হতো। কিন্তু সকালের এই সময়টাতে সেটা পাওয়া কঠিন ব্যাপার। বেশ কিছুক্ষণ শ্যামলি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকার পর ‘ধ্যাত্তেরি’ বলে স্বভাববিরোধী একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। অফিস কামাই দেয়ার সিদ্ধান্ত।

বাড়িতে ফিরে মায়ের হাজার প্রশ্নের মুখোমুখি হলো। কেন অফিসে গেলো না, শরীর খারাপ নাকি, কি হয়েছে ইত্যাদি। যতই সে বুঝাতে চায় যে আজকে তার বিনা কারণেই কাজে যাওয়ার ইচ্ছা নাই, ততই মায়ের মুখে চিন্তার রেখা আরো স্পষ্ট হয়। এই বয়সের ছেলেদের নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা করতে কোন কারণ লাগে না। রাশেদ আর বেশি কিছু না বলে নিজের ঘরে এসে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। দেখলো বিছানায় আজকের নিউজপেপারটা পড়ে আছে। জামাকাপড় ছেড়ে পত্রিকাটা মেলে ধরল চোখের সামনে। খবরের কাগজে পড়ার তেমন কিছু পায় না সে। খবরের কাগজ ব্যাপারটাই তার একঘেয়ে লাগে। একদিনের কাগজ তার আগের দিনেরটারই কপি বলে মনে হয়। কিছুক্ষণ পেপারটা উল্টেপাল্টে বিনোদন, খেলার খবর বা ভাগ্যচক্র পড়া হয়ে গেলে পড়ার মতন আর কিছু খুঁজে পায় না সে। সেটা সরিয়ে রেখে মনে মনে ভাবতে লাগলো, অফিসে যে গেলো না, এখন সারাদিন সে কী করবে। প্রথমেই মনে হলো আজকে সেই গল্পটা লিখতে বসা যায়। বেশ সময় কেটে যাবে গল্প লেখা হোক আর না হোক।

রাশেদ কাজকর্মে বেশ মেথডিক্যাল। প্রথম প্রথম যখন লিখতে বসে কিছুই লেখা হচ্ছিল না, কিছুটা অস্থির হলেও হাল ছেড়ে দ্যায়নি। ক্রিয়েটিভ রাইটিং এর উপরে বইপত্র যোগাড় করে, ইন্টারনেট থেকে কিছু আর্টিকেল ডাউনলোড করে বেশ আয়োজন করে কিছু পড়ালেখা করে নিয়েছে। এগুলোর মধ্যে তার একটা বই বেশ ভালো লেগেছিলো। জেমস্‌ এন. ফ্রে-এর লেখা। নাম ‘How to Write a Damn Good Novel’। বইটা ভালো লাগার একটা কারণ হলো, লেখার ব্যাপারটাকে সেখানে খুব সহজ করে দেখানো হয়েছে। how to-ধরনের বই পড়তে এইজন্যে রাশেদের ভালো লাগে। বইগুলোতে ভনিতা থাকে না বেশি।

একেবারে আনকোরা নতুন রাইটিং প্যাডটার প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে চরিত্রগুলোর নাম লিখে ফেলে সে। পাশে চরিত্রের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা।

১। পথিক- গল্পের প্রধান চরিত্র। সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার অভাবে প্রেমিকার সাথে বিয়ে হয়নি। দীর্ঘদিন পর পুরনো প্রেমিকার সাথে যোগাযোগ। নায়লাকে পাওয়ার জন্য বেপরোয়া।
২। নায়লা- পরিবারের চাপাচাপিতে অন্য পুরুষের সাথে বিয়ে যা সে মেনে নিতে পারেনি। দীর্ঘদিন পর পুরনো প্রেমিকের সাথে যোগাযোগ। মানসিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। একদিকে পথিকের জন্য মমতা আর অন্যদিকে সমাজ।
৩। নায়লার স্বামী-(নামটা এখনো ঠিক করা হয়নি। সাজ্জাদ নামটা কেমন? মেজর সাজ্জাদ।)- সামরিক কর্মকর্তা। অত্যন্ত ভালো মানুষ। বুদ্ধিমান ও হৃদয়বান পুরুষ।

এইটুকু লেখার পর রাশেদ বড় বড় করে লিখল,

প্লটঃ পথিক ও নায়লার পরকীয়া প্রেম

কলমের পিছন দিকটা মুখে গুঁজে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ে রাশেদ। এখন গল্পে একটা ক্রাইসিস লাগবে। একটা সমস্যা তৈরি করতে হবে চরিত্রগুলোকে ঘিরে। একটা ক্লাইম্যাক্সে নিয়ে আসতে হবে সেগুলোকে। ক্রাইসিসটা কিভাবে তৈরি করা যায় ভাবছে। হঠাৎ করে মনে হলো খুব পুরনো একটা বিষয় নিয়ে আসলে লেখার পরিকল্পনা করছে সে। লিখতে বসার সময়কার প্রাথমিক উৎসাহ ঝিমিয়ে আসে এটা ভেবে। তারমানে ঘটনাগুলোকে বেশ ব্যতিক্রমী ধরনের হওয়া লাগবে। নতুন ধরনের কিছু।

আলসেমি জাগানো দুপুরের ভ্যাপসা গরম আর লেখার কাগজকলম ছাড়িয়ে কল্পনাকে আকাশে ডানা মেলতে দিলো রাশেদ। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ভাবছে সে। শুরুটা কেমন হতে পারে? কিছুদিন আগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ছোটগল্পগুলো সম্পর্কে একজনের একটা আর্টিকেল দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে সে পড়েছিলো। মানিক নাকি মনে করতেন ছোটগল্পগুলোর এক ধরনের ফরম্যাট হতে পারে এরকম যে, সেটা হবে কোন একটা মানুষের দশ থেকে পনেরো মিনিটের চিন্তার বর্ণনা। এই চিন্তার বর্ণনার মাঝে ফুটে উঠবে ঐ মানুষটাকে ঘিরে একটা ঘটনা। কিন্তু রাশেদ কোন ধরনের মানসিক পরিক্রমার কথা লিখতে চাচ্ছে না। সে চাচ্ছে এমনধরনের একটা গল্প লিখতে ব্যক্তিগতভাবে যে ধরনের লেখা সে নিজে পছন্দ করে। অর্থাৎ ছোটগল্প হলে তাতে থাকতে হবে অপ্রত্যাশিত কোন পরিসমাপ্তি। যাতে পাঠকের মনে একটা দাগ রেখে যেতে পারে গল্পটা।
রাশেদ
একটা গল্পের প্লট বেশ কয়েকদিন হলো মাথায় নিয়ে ঘুরছে রাশেদ। সে গল্পকার বা লেখক নয়। লেখালেখির তেমন কোনো শখ বা খেয়ালও তার আগে কখনোই ছিল না। তবে একদিন এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় একটা শপিং সেন্টারে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে প্রথমবার তার একটা গল্প লেখার ইচ্ছে হলো। অভ্যেস নেই বলে প্রথম প্রথম কাগজ কলম নিয়ে বসে তেমন একটা লাভ হয়নি; সুকুমার রায়ের আঁকা অদ্ভূতুড়ে দেখতে প্রাণীগুলোর মতন কিছু জন্তুজানোয়ার আঁকা ছাড়া। লিখতে বসে আবার কয়েকবার এটাও মনে হয়েছে যে সে তো জীবনে কখনোই লেখক হতে চায়নি। সত্যি বলতে কি জীবনে কখনোই নির্দিষ্টভাবে কোনকিছু সে হতে চেয়েছে বলেও তার মনে পড়ে না। তাই ভাবতে থাকে কেন সে লিখবে? অবশ্য বই পড়ার একটা বাতিক তার আছে। ইশকুল জীবনে মাসুদ রানা পড়ার অভ্যেসটা সিডনি শেলডন, স্টিফেন কিং, রবার্ট লুডলাম, রবিন কুক আর হালের ড্যান ব্রাউন-মানে থ্রিলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছিল। বাংলাতেও তাই শরদিন্দু, সত্যজিৎ বা হুমায়ূন আহমেদের মতন খুব জনপ্রিয় লেখকের লেখা ছাড়া পড়া হয়নি। থ্রিলার বা রোমান্টিক উপন্যাসের ছোটখাটো সংগ্রহও গড়ে উঠেছিল যেটা বন্ধু-বান্ধবের পাঠাভ্যাসের কল্যাণে বহু আগেই বিলুপ্তপ্রায়। তাই মনে হয় যে মানুষকে জানাবার মতন তেমন কোনো জ্ঞানের কথা তার নেই যে সে লিখবে। আর এমন সাদামাটা একটা জীবন তার যে লেখার মতন অভিজ্ঞতাও তার খুব একটা নেই। লেখালেখি করবে শিল্পের সাধক টাইপের লোকজন বা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ধরণের জ্ঞানী মানুষেরা। সে তো কোনো দলেই পড়ে না।

রাশেদ একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করে। বেশ ভালো অংকের বেতন পায়। ঝামেলাবিহীন জীবন। পাশ করে একদিনের জন্যেও বেকার থাকতে হয়নি। তেমন বড় কোন উচ্চাশা নেই জীবনে। দেখতে সরল হলেও বোকা নয় সে। তার প্রমাণ কাজেকর্মে এই একটি বছরের মধ্যেই অফিসে সে নিজের যথেষ্ঠ দক্ষতা দেখাতে পেরেছে।

গল্প লেখার ইচ্ছেটা হয়েছিল সেদিন সন্ধ্যেয় দুটো মানুষকে দেখে। তাদের পাশে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে। ঐ মানুষ দুজনও তার মতনই বৃষ্টির জন্য আটকা পড়েছিল। ঝলমলে বিশাল বসুন্ধরা সিটি শপিং সেন্টারের এক্সিটে দাঁড়ানো অনেকগুলো মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল তারা তিনজন। মানুষ দুজন সমবয়সীই হবে। একজোড়া যুবক-যুবতী ওরা। আটাশ-ঊনত্রিশ হবে বয়স। দুজন দুজনাতে ভীষণ মগ্ন। এমনভাবে কথা বলছিল তারা আশেপাশে যে আরও মানুষ আছে সেটা নিয়ে যেন দুজনেই তোয়াক্কা করে না। কেউ কিছু শুনলে যেন কিছু আসে যায় না তাদের। অথচ রাশেদ মোটামুটি নিশ্চিত ব্যাপারটা এমন হওয়ার কথা নয় মোটেও। কারণ ওদের এতক্ষণের আলাপ শুনে সে যেটা বুঝেছে তা হল মেয়েটা বিবাহিতা। স্বামী সম্ভবত আর্মির ক্যাপ্টেন বা মেজর গোছের কিছু একটা হবে। মেয়েটাকে ডাকা হচ্ছিল নায়লা বলে। আর যুবকটির নাম প্রতীক অথবা পথিক। নায়লা নামের মেয়েটার আহ্লাদি ধরনের উচ্চারণের জন্যে নিশ্চিত হতে পারছিল না। পরে মনে হল নামটা পথিকই হবে।

রাশেদ আগাগোড়া ভদ্রলোক ধরনের মানুষ। ছোটবেলা থেকেই। নিজের অজান্তেই সবসময় সে অতিরিক্ত ভদ্র। তাই পাশে দাঁড়ানো পরকীয়া প্রেমেমত্ত প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তরঙ্গ আলাপ আড়ি পেতে শোনার জন্যে খানিকটা গ্লানি সে অনুভব করছিল। সবচেয়ে নিপাট সাধুর মাথায়ও খানিকটা বদ খেয়াল চাপতে পারে। তাই তার অপরাধ ততটা গুরুতর বলা যায় না। তাছাড়া সময়টাও বেশ কেটে যাচ্ছিল কথার পিঠে কথার খেলা শুনতে শুনতে।

ছেলে আর মেয়েটা খুব সম্ভবত একই ইউনিভার্সিটির একই ডিপার্টমেন্ট থেকে পাশ করেছিল। প্রেমের সম্পর্কটা তাই নতুন নয়। হয়তো বিয়েও হওয়ার কথা ছিল। সম্ভবত বাস্তবতা নামের স্বেচ্ছাচারী ক্ষুদে ঈশ্বরের গোয়ার্তুমিতে বিয়েটা হয়নি। রাশেদ খানিকটা যেন কল্পনায় মেতে ওঠে অচেনা মানুষ দুজনের ফেলে আসা ঘর-বাঁধার-স্বপ্ন-গড়া-ভাঙ্গার দিনগুলো নিয়ে। হয়তো মেয়েটার বাবা-মা জোর করে অন্য লোকের সাথে বিয়েতে বাধ্য করেছিলো; হতে পারে পথিক নামের ছেলেটা তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে।

“ডিভোর্স এতো সহজ ব্যাপার না, বোকা কোথাকার।” মেয়েটা বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল। “আর তাছাড়া আর্মি অফিসারদের ইগো বোঝো? এটা ওদের ক্যারিয়ারের জন্য ভীষণ একটা নেগেটিভ। ঘরের বউ সামলাতে পারে না, এমন অফিসার সাবোর্ডিনেটদের কিভাবে সামলাবে-এই টাইপ ব্যাপার। বুঝলা?” একটু থেমে চোখমুখ শক্ত করে মেয়েটা বলে ওঠে, “ও আমাকে এতো সহজে ছাড়বে না, আমি জানি।” রাশেদের পরিপাটি ভদ্র চোরাচাহনি ততক্ষণে জরীপ করে নিয়েছে নায়লাকে। কিছু কিছু মেয়েকে দেখলেই বিজ্ঞাপনের মডেল মনে হয়। এরা পোশাকের নতুন ফ্যাশন, হেয়ারস্টাইল ইত্যাদি রাশেদের আরো অনেক অজানা ব্যাপার নিখুঁতভাবে মেনে চলে। নায়লাকে সেরকমই একজন মনে হলো। চুলে ব্রাউন রঙ করা। লম্বা এবং বলতে নেই বেশ আকর্ষণীয় ফিগার। গায়ের রঙ ফর্সা আর শ্যামলার মাঝামাঝি। মোটকথা, হতভাগা আর্মি পার্সনটির বউখানা একজন অতি সুন্দরী যুবতী; ‘যৌনাবেদনময়ী’ শব্দটা চট করে মনে আসার মতন।

পথিক নামের যুবকটি সেই তুলনায় এক্কেবারে সাদামাটা। মাঝারি উচ্চতা। বিশেষত্বহীন চেহারা। তবে বেশ পরিপাটি। নায়লার কথা শুনে পথিকের চোয়াল শক্ত হতে দেখলো রাশেদ। চেহারায় রাগ। গজগজ করে বলল, “তো এখন আমরা কী করব? কলেজ পালানো ছেলেমেয়েদের মত লুকিয়ে চুরিয়ে জাঙ্কফুডের দোকানে বসে বসে প্রেমের খেলা কন্টিনিউ করব? এটাই তোমার ইচ্ছা! স্টুপিড!” একটা শব্দও রাশেদের কান এড়ালো না।

যেকোন কারণেই হোক, প্রেম জিনিসটা কখনো করা হয়ে ওঠেনি রাশেদের। সে নিজেও ভেবেছে ব্যাপারটা নিয়ে। ইউনিভার্সিটি থেকে বের হবার পর এই এক বছরের মধ্যেই ওর অনেক বন্ধুবান্ধব বিয়ে করে ফেলেছে। বিশেষ করে ক্লাশে যে ‘জুটি’গুলো ছিলো, তারা তো অনেক আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। পথেঘাটে সুন্দর দেখতে মেয়েগুলোর দিকে প্রায়ই থমকে তাকিয়ে থাকে সে। এদের কাউকে কাউকে প্রেমিকা বা বউ হিসেবে কল্পনা করার চেষ্টা করে।

অফিস থেকে ফিরে যখন বাসায় কোন কাজ থাকে না, টিভির রিমোট কন্ট্রোল টিপতে টিপতে অলস সময় কাটায় সে মাঝে মাঝে। অসংখ্য চ্যানেলে অসংখ্য নাটক আর সিরিয়াল। সেখানে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কগুলো কতরকম জটিলতার মধ্যে দিয়ে যেতে পারে সেগুলো দেখানো হয়। সেগুলো দেখে দেখে একা একা ঝামেলাবিহীন জীবন যে খারাপ নয় সেটা ভালোই বুঝতে পারে সে। নিজের খেয়ালখুশিতে চলতে পারার একটা সহজ আনন্দ আছে। সেটা হারানোর কোনো মানে হয় না। তবু মাঝে মাঝে বিপরীত রাস্তায় রিকশাতে অন্তরঙ্গভাবে বসে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেখলে অথবা কোন উৎসবে তাদের উল্লাস দেখলে তারও আফসোস হয়। একেবারে নিজের একটা মানুষের সে অভাব অনুভব করে। মানুষের জীবনে বড় ধরনের সমস্যা না থাকলে যা হয়।

ইউনিভার্সিটিতে বা কর্মক্ষেত্রে নানাভাবে মেয়েদের সংস্পর্শে আসতে হয়েছে তাকে। কিন্তু কোথাও কখনো সেভাবে কোন নির্দিষ্ট কারো প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেনি সে। বন্ধুদের অনেককে দেখেছে ‘টাইম পাসে’র জন্য যেমনতেমনভাবে পরিচিত মেয়েদের সাথে ঘোরাঘুরি করতে। এদের পরিচয়ের উৎস বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট অথবা বন্ধুর বন্ধু অথবা বন্ধুর বন্ধুর বন্ধু-এভাবে। সেরকম কোন সম্পর্কের ইচ্ছেও হয়নি তার। তবে বন্ধুদের আদিরসাত্মক গল্পগুলো শুনতে মন্দ লাগেতো না তার।

তবু ঐদিন পথিক এবং নায়লার কথোপকথন শুনে রাশেদের মাথায় নরনারীর সম্পর্ক বিষয়টাতে নতুন একটা ব্যাপার যোগ হল। পরকীয়া। নাটক গল্প উপন্যাসে অনেকবার পেয়েছে সে এই ব্যাপারটা। কিন্তু চোখের সামনে ওদের দেখে বিষয়টা মাথায় বেশ জায়গা করে নিল। বৃষ্টি কমে আসার পর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো সবাই যে যার পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। রাশেদও সিএনজি খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ততক্ষণে পথিক আর নায়লা হারিয়ে গেছে ভীড়ের মাঝে। আর রাশেদের মাথার মধ্যে রেখে গেছে একটা গল্পের প্লট আর গল্প লেখার ইচ্ছেটা।



তৌফিক
“কী হলো? এখনও রেডি হওনি তুমি!” নায়লার দেরি দেখে বিরক্ত হলো তৌফিক। “এতক্ষণে সবাই হয়তো পৌঁছে গেছেন। প্লিজ একটু তাড়াতাড়ি কর।” বলতে বলতে মেজর তৌফিক বেডরুম থেকে ব্যালকনিতে এসে একটা সিগারেট ধরায়। নায়লা মাঝে মাঝে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বুঝতে চায় না, ক্যারিয়ারের জন্য একজন সামরিক কর্মকর্তার জীবনে সময়ানুবর্তি হওয়া কতটা জরুরি। তৌফিকের মনে হয় যে নায়লা এটা ইচ্ছা করেই করে। তাকে রাগিয়ে দিয়ে মজা পায়।

নায়লা আরো সময় নেয়। ক্যান্টনমেন্টের জীবনে একজন মেজরের দায়িত্বশীল স্ত্রী হিসেবে মানিয়ে নিতে পারেনি বলে নয়। কেউ কিছু চাপিয়ে দিলে সহ্য হয় না ওর। খুব ধীরে ধীরে কানের দুলজোড়া পরে সে। বিউটি পার্লারে ঘন্টাকতক কাটিয়ে আসার পরও তাই সময় লাগে। “এই তো, আর পাঁচ মিনিট। এতো অস্থির হও কেন?” বেডরুম থেকে নায়লার কন্ঠ ভেসে আসে।

ঘনঘন সিগারেটে টান দ্যায় তৌফিক। কিছুক্ষণ পরে আধখাওয়া সিগারেটটা গুঁজে দ্যায় ব্যালকনিতে রাখা টি-টেবিলের অ্যাশট্রেতে। নায়লাকে ইচ্ছে করে সন্ধ্যে সাতটার বদলে সাড়ে ছয়টার কথা বলেছিলো সে। তাও এখন প্রায় সাতটা বাজতে চলেছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাত আবার চলে যায় সিগারেটের প্যাকেটের দিকে। লাইটার দিয়ে ঠোঁটে ঝোলানো সিগারেটটা ধরাতে যাবে, এমন সময় নায়লার গলা শোনা গেলো। “অ্যাই, এদিকে এসো তো একটু।”

কালো জর্জেটের আঁচলটা বাঁ হাতে মেলে ধরে মোহনীয় ভঙ্গিতে তৌফিকের সামনে নিজেকে মেলে ধরল নায়লা। ডানহাত কোমরে। ঠোঁটে হাসি। “কেমন লাগছে আমাকে বলো।”

তৌফিক সাজসজ্জার দিকে না তাকিয়ে সোজা নায়লার চোখের দিকে তাকায়। অস্বস্তির সাথে চোখ সরিয়েও নেয়। নিজের স্ত্রীর আত্মবিশ্বাস দেখে অবাক হয় মেজর তৌফিক। বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ নেই নায়লার চোখে।

তৌফিক জানে কাজটা অপরাধের মধ্যে পড়ে। কিন্তু সেদিন নায়লার মোবাইলের এসএমএস ইনবক্স না ঘাটলে তো এখনও সে জানতে পারত না তার স্ত্রী অনৈতিকভাবে পরপুরুষের সাথে একটা সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। তৌফিকের এখনো বিশ্বাস হয় না। আবার বিশ্বাস না করেও সে পারে না। নায়লাকে সরাসরি কিছু বলবে কিনা ভেবেছে এর মধ্যে বেশ কয়েকবার।



নায়লা
পুরুষের চোখে মুগ্ধতা দেখে দেখে ব্যাপারটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে নায়লা। আগের মতন তাই মুগ্ধ চোখগুলো তাকে শিহরিত করে না। প্রতি একশো পুরুষের একশোজনের চোখে সে নিজেকে আয়নার মতন দেখে নিতে পারে। দেখে দেখে আরো আত্মবিশ্বাস পায়। মুগ্ধতার সাথে সাথে কিছু পুরুষের চোখে যখন তীব্র কামনা জেগে উঠতে দ্যাখে, তখন এক ধরনের কৌতুক অনুভব করে সে। পুরুষগুলো এমন হ্যাংলা হয়! এই তো যেমন সেদিন পথিকের সাথে শপিং শেষে বসুন্ধরা সিটির নীচে পথিকের সাথে ঝগড়া করতে করতে হঠাৎ তার মনে হলো কেউ তাকে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। আড়চোখে তাকাতে খেয়াল করল একটা ছেলে তাকে বেশ কৌতূহল নিয়ে দেখছে। অভদ্রের মতন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে আবার পথিকের দিকেও তাকাচ্ছে। ছেলেটার বয়স পঁচিশের বেশি হবে না। সহজসরল চেহারা। পথিকের দিকেও তাকাচ্ছে মাঝে মাঝে। আড়ি পেতে ওদের কথা শুনছিল না তো? শুনুকগে। আমল দিলো না আর ছেলেটাকে। তৌফিকের সাথে পার্টিতে গেলেও সেই একই অভিব্যক্তির ছড়াছড়ি। মাঝে মাঝে ভীষণ একঘেয়ে লাগে তার।

এই যেমন আজকেও যেতে হবে একটা পার্টিতে। তৌফিকের তাড়াহুড়ো দেখেও সে আস্তে আস্তে তৈরি হয়। তার নিজের কোন তাড়া নেই। ক্যান্টনমেন্টের এসব সামাজিকতা তার ইদানিং অসহনীয় লাগে। কতগুলো শ্যভিনিস্ট তাদের ব্যক্তিত্বহীন বউগুলোকে নিয়ে সেখানে হাজির হয় আর নানাপদের সেন্স অভ হিউমার দেখাতে থাকে। ভাবীরাও এমনসব বিষয় নিয়ে গল্পে মেতে অঠে যেগুলোতে তার কোন কৌতূহল নেই।

মাঝে মাঝে মনে হয় বিয়ে করা আর আত্মা বিক্রি করা একই কথা। এই যে তার নিজের কোন ক্যারিয়ার গড়ে উঠল না, স্বেচ্ছাস্বাধীনভাবে চলাফেরাতে পদে পদে কৈফিয়ত আর কৈফিয়ত- বিয়ের জন্যই তো এই দমবন্ধ করা জ়ীবন তার।




পথিক
মোটরসাইকেলটার স্পীড ঠিকমতন উঠছে না। সাত-সকালে অফিসে যাওয়ার সময়ই বিরক্তির মুখোমুখি হলো পথিক। এমনিতেই রাতে ঘুম হয়নি ভালো। নায়লার সাথে মোবাইলে কথা শেষ হতে হতে রাত দু’টো বেজেছিল। ঘন্টাখানিক ধরে অহেতুক কথা কাটাকাটি করে ঘুম চলে গিয়েছিলো। ঘুমোবার জন্য একটা ডরমিকাম খেয়ে শুয়েছিলো। তার পরেও ঘুমানোর আগে শেষবার বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনটাতে সময় দেখেছিলো তিনটে দশ। অর্থাৎ কমসে কম সাড়ে তিনটা বেজেছে ঘুমাতে। পথিক জানে রাতে কম ঘুম হলে তার জের টানতে হয় সারাদিন। তার উপর সিডেটিভ খাওয়ার প্রভাব তো রয়েছেই। অথচ আজকে অফিসে খুব ব্যস্ত একটা দিন যাওয়ার কথা তার।

মোটরসাইকেলটা ওর একটা বিশ্বস্ত সঙ্গী। বন্ধুর মতন। কেনার পর থেকে খুব ভালো সার্ভিস দিচ্ছে। সহজে গড়বড় করে না। আজকে কী হলো কে জানে! বেশ কয়েকবার বেপরোয়া পিক্‌আপ তুলেও যখন দেখলো ঠিকমতন গতি উঠছে না, সিদ্ধান্তে পৌঁছলো ক্লাচপ্লেটে সমস্যা। বদলাতে হবে মনে হয় ক্লাচপ্লেটটা। একেবারে সার্ভিসিং-এ দেবে বলেই ঠিক করলো।

ঢিমেতালের গতিতে অফিসের দিকে যেতে যেতে গতকাল রাতে নায়লার সাথে মোবাইলে কথা কাটাকাটির কথা ভাবতে লাগলো সে। সেদিন সন্ধ্যায় ওরা দেখা করেছিলো বসুন্ধরা সিটিতে। নায়লাই শপিং-এ এসে ওকে ফোন করেছিলো। অফিস থেকে সোজা ও চলে এসেছিলো শপিং সেন্টারে। নায়লা কিছু টুকটাক কেনাকাটা করলো। একসাথে সময় কাটানোর জন্যে ঘুরতে ঘুরতে বেশ কিছু ডিভিডি কিনলো পথিক। জানে একটা মুভিও দেখার সময় পাবে না। বেরবার সময় শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টি থামবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ই আসলে গোলমালটা শুরু হয়েছিলো। ডিভোর্সের কথা তোলায় এইভাবে নায়লা প্রায় সিন-ক্রিয়েট করবে আগে ভাবেনি পথিক। নায়লার উপরে যেমন রাগ উঠলো, নিজের উপরও উঠলো। নইলে একসাথে শপিং-এর সময়টা খুব ভালো কেটেছিলো ওদের। গতরাতের ঝগড়ার কারণও ছিলো একই।

পথিক নিশ্চিত যে ডিভোর্সের ঝামেলার মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে নায়লা। অথচ এদিকে পথিক নিজে বাসায় তার বাবা-মাকে প্রায় রাজি করিয়ে ফেলেছে একটা ডিভোর্সি মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেওয়ার ব্যাপারে। কে জানে কত ঝামেলা পোহাতে হবে সামনে। ঐ ব্যাটা আর্মি মেজরও তো ঝামেলা কম করবে না। এসব ভাবতে ভাবতে অফিসে পৌঁছে গেলো পথিক।

পথিকের অফিসটা বনানিতে। বেশ নামকরা একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। ওর কাজ মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে। মোটরসাইকেল বেসমেন্টে পার্ক করে চাবির রিংটা আঙ্গুলে ঘোরাতে ঘোরাতে গ্রাউন্ড ফ্লোরের লিফটের দিকে এগোল সে। কিন্তু লিফটের সামনের লাইনে দেখা হয়ে গেলো সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার জুনায়েদ সিদ্দিকি অর্থাৎ ওর ইমিডিয়েট বসের সাথে। ভাগ্যটাকে গালাগাল করা ছাড়া আর কিছু করার নেই; কারণ জুনায়েদ ভাই তাকে দেখে ফেলেছেন।

“স্লামালেকুম, জুনায়েদ ভাই। কেমন আছেন?”
“ওয়ালাইকুম সালাম। এই তো আছি ভালোই। আমাকে খারাপ থাকতে দেখেছো কখনো? খারাপ থাকাথাকির মধ্যে আমি নেই। তুমি কেমন আছো বলো। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে তো?” কথা বেশি বলে লোকটা। এমনিতে মানুষ খারাপ না।
“জি, এইতো, ভালোই চলছে...”

তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ লাইনে দাঁড়ানো দুজন। লম্বা লাইন। হঠাৎ জুনায়েদ পিছন ফিরে পথিককে জিজ্ঞেস করে, “কী ব্যাপার, পথিক, আপনার শরীর খারাপ নাকি?”

“না তো। কেন ভাইয়া, দেখে তাই মনে হচ্ছে নাকি?”
“হুম্‌ম। শরীরের দিকে খেয়াল রাখবা, বুঝলা? এক কাজ কর, বিয়েটিয়ে করে ফেলো। গার্লফ্রেন্ড আছে না? তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলো। নাইলে দেখবা রেগুলার ঝগড়াঝাটি করে মেজাজ খারাপ করে অফিসে আসতেছো। কাজে মন বসতেছে না। হা হা হা।” জুনায়েদ তার জুনিয়রদের সাথে বেশ বন্ধুসুলভ আচরণ করার চেষ্টা করে, যেটা বেশিরভাগ সময়ই অপরপক্ষের জন্য বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। এটা নিয়ে অবশ্য তার কোন মাথাব্যাথা আছে বলে মনে হয় না। ওদের অফিস চৌদ্দ তলায়। সবকিছুরই শেষ আছে। জুনায়েদ ভাইয়ের সাথে লিফটে চৌদ্দ তলায় এসে নিজের ডেস্কে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পথিক।

কম্পিউটারটা অন করে উঠে গিয়ে এক মগ কফি বানিয়ে নিয়ে এসে কাজে বসল। বারোটার মধ্যেই একটা প্রেজেন্টেশন রেডি করতে হবে। সময় কম। রাতজাগা ক্লান্তির কিছুটা দূর হলো কফির মগে চুমুক দিয়ে। তবু কিছুটা ক্লান্তি রয়েই গেলো। প্রেজেন্টেশনের ম্যাটেরিয়ালগুলো বেশির ভাগই গতকাল ইন্টারনেট থেকে যোগাড় করে রেখেছিল বলে রক্ষা। এখন শুধু স্লাইডগুলো সাজাতে হবে। আশা করল বারোটার মিটিং-এর অনেক আগেই শেষ হয়ে যাবে কাজটা। কিছুক্ষণের মধ্যে কাজের মধ্যে ডুবে গেলো সে। প্রেজেন্টেশন্টা ভালো হওয়া খুব জরুরি। জি. এম. মার্কেটিং লোকটা পথিকের ভাষায় একটা আস্ত খাটাশ। খুব খুঁতখুঁতে। ছোটখাটো ফাঁক পেলেই হলো। এমন একটা মন্তব্য করে বসবে যা হজমও করা যাবে না আবার সহ্যও করা যাবে না। আশার কথা হলো লান্‌চ আওয়ারের অল্প সময় আগে মিটিংটা। খুব লম্বা হওয়ার কথা না।

প্রেজেন্টেশন স্লাইডগুলো এডিট করতে করতে ছোট্ট একটা তথ্যে চোখ আটকে গেলো পথিকের। তথ্যটির পাশে বুদ্ধি করে সেটার রেফারেন্স হিসাবে ওয়েবসাইটের ঠিকানা রেখেছিলো বলে নিজের উপর খুশি হয়ে উঠলো। ওয়েবসাইটটা ব্রাউজারে খুলে পড়তে শুরু করলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে নিজের অজান্তে উত্তেজনায় চেয়ারে মেরুদণ্ড সোজা করে বসলো। তারপর কিছুক্ষণ চললো বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ওড়াউড়ি। অবশেষে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটলো পথিকের। হাসিটা ঝুলে রইলো অনেকক্ষণ। কাজ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে এইমাত্র পাওয়া ইনফরমেশনগুলো সাজাতে লাগল মনে মনে। ধীরে ধীরে একটা পরিকল্পনা গড়ে তুললো। কোথাও ফাঁক নেই এমন একটা পরিকল্পনা।

আজকের মিটিংটা একটা বিশেষ ধরনের এন্টিহিস্টামিন জাতীয় অষুধের উপর। এলার্জি বা সাধারণ সর্দি-কাশিতে ব্যবহৃত হয় এমন। তথ্যগুলো সেটারই একটা উপাদান নিয়ে। এমনিতে সেটা নিরীহ। কিন্তু নিকোটিনের সাথে মিশিয়ে সেটা বেশিমাত্রায় গ্রহণ করলে মৃত্যু নিশ্চিত অর্থাৎ সহজভাবে বলতে গেলে সাধারণ সর্দি-কাশির অষুধের একটা উপাদান আর নিকোটিন একসাথে মিলে একটা কার্‌যকর নিউরোটিক বিষ। টক্সিকোলজির একটা অনলাইন জার্নালে খুব সাধারণভাবে লেখা কথাটাই চিন্তার ঝড় তুলেছে পথিকের মধ্যে। শুধু তা-ই নয়। এই বিষে মৃত্যু হলে পনেরো থেকে বিশ মিনিটের মধ্যেই মৃতদেহের রক্ত বা ফুসফুসের আলামত থেকে বিষ সনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। মৃত্যুর কারণ মনে হবে সাধারণ কার্ডিও-মাইয়প্যাথি বা সহজ বাংলায় হার্ট অ্যাটাক। ফরেন্সিক স্পেশালিস্টদের একটা ফোরামে এই ধরণের বিষ সনাক্তকরণ নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা পাওয়া গেলো যার সারমর্ম দাঁড়ালো, যে ধরণের স্পেক্‌ট্রোগ্রাফ গ্যাস অ্যানালাইজার এই শ্রেণীর বিষ মৃতদেহের নানান আলামত থেকে সনাক্ত করতে পারে, সে ধরণের প্রযুক্তি উন্নত বিশ্বের কিছু দেশের বাইরে কোথাও ব্যবহৃত হয় না বললেই চলে।

চোখেমুখে এই আবিষ্কারের আনন্দ থাকায় মিটিং-এ চমৎকার সপ্রতিভ মনে হলো পথিককে। জি. এম. মার্কেটিং-কে দেখে বোঝা গেলো ভদ্রলোক সন্তুষ্ট।

পথিকের এতোটা খুশি হওয়ার কারণ আর কিছুই নয়। মিটিং থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে প্রোডাক্ট হিসেবে ঐ বিশেষ এন্টিহিস্টামিনের বাজারজাতকরণের প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি ভুল হয়নি এবং সৌভাগ্যক্রমে নায়লার স্বামী একজন স্মোকার। সকালের বিরক্তি বা মেজাজ খারাপের লেশমাত্র আর রইল না পথিকের জ্বলজ্বলে চোখজোড়ায়; একটা চমৎকার খুনের পরিকল্পনা করতে পেরে।

রাশেদ
ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটে চলাচল দিনকে দিন আরো বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। অফিসের ‘পিক অ্যান্ড ড্রপ’ সার্ভিস মিস করলে তাই যাতায়াতটা অসহনীয় হয়ে পড়ে। রাশেদের বাসা শ্যামলির শেখেরটেকে। এমনিতে শেখেরটেক থেকে গুলশান যাওয়াটা আগে যতটা ঝামেলার ছিল এখন ততটা নেই। অনেকরকম বাস সার্ভিস চালু হয়েছে বছরখানেক হলো। বড় বড় সিএনজি চালিত বাস। বিশাল শব্দ তুলে রাস্তায় সেগুলো শ্লথগতিতে চলে। অনেক সময় নষ্ট হয় সেগুলোতে উঠলে।

রাশেদ আজকেও অফিসের গাড়ি মিস করেছে। বাসে উঠবে না। ঘামের দুর্গন্ধ সহ্য হয় না বাসের ভীড়ে তার। একটা ট্যাক্সি পেলে ভালো হতো। কিন্তু সকালের এই সময়টাতে সেটা পাওয়া কঠিন ব্যাপার। বেশ কিছুক্ষণ শ্যামলি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকার পর ‘ধ্যাত্তেরি’ বলে স্বভাববিরোধী একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। অফিস কামাই দেয়ার সিদ্ধান্ত।

বাড়িতে ফিরে মায়ের হাজার প্রশ্নের মুখোমুখি হলো। কেন অফিসে গেলো না, শরীর খারাপ নাকি, কি হয়েছে ইত্যাদি। যতই সে বুঝাতে চায় যে আজকে তার বিনা কারণেই কাজে যাওয়ার ইচ্ছা নাই, ততই মায়ের মুখে চিন্তার রেখা আরো স্পষ্ট হয়। এই বয়সের ছেলেদের নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা করতে কোন কারণ লাগে না। রাশেদ আর বেশি কিছু না বলে নিজের ঘরে এসে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। দেখলো বিছানায় আজকের নিউজপেপারটা পড়ে আছে। জামাকাপড় ছেড়ে পত্রিকাটা মেলে ধরল চোখের সামনে। খবরের কাগজে পড়ার তেমন কিছু পায় না সে। খবরের কাগজ ব্যাপারটাই তার একঘেয়ে লাগে। একদিনের কাগজ তার আগের দিনেরটারই কপি বলে মনে হয়। কিছুক্ষণ পেপারটা উল্টেপাল্টে বিনোদন, খেলার খবর বা ভাগ্যচক্র পড়া হয়ে গেলে পড়ার মতন আর কিছু খুঁজে পায় না সে। সেটা সরিয়ে রেখে মনে মনে ভাবতে লাগলো, অফিসে যে গেলো না, এখন সারাদিন সে কী করবে। প্রথমেই মনে হলো আজকে সেই গল্পটা লিখতে বসা যায়। বেশ সময় কেটে যাবে গল্প লেখা হোক আর না হোক।

রাশেদ কাজকর্মে বেশ মেথডিক্যাল। প্রথম প্রথম যখন লিখতে বসে কিছুই লেখা হচ্ছিল না, কিছুটা অস্থির হলেও হাল ছেড়ে দ্যায়নি। ক্রিয়েটিভ রাইটিং এর উপরে বইপত্র যোগাড় করে, ইন্টারনেট থেকে কিছু আর্টিকেল ডাউনলোড করে বেশ আয়োজন করে কিছু পড়ালেখা করে নিয়েছে। এগুলোর মধ্যে তার একটা বই বেশ ভালো লেগেছিলো। জেমস্‌ এন. ফ্রে-এর লেখা। নাম ‘How to Write a Damn Good Novel’। বইটা ভালো লাগার একটা কারণ হলো, লেখার ব্যাপারটাকে সেখানে খুব সহজ করে দেখানো হয়েছে। how to-ধরনের বই পড়তে এইজন্যে রাশেদের ভালো লাগে। বইগুলোতে ভনিতা থাকে না বেশি।

একেবারে আনকোরা নতুন রাইটিং প্যাডটার প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে চরিত্রগুলোর নাম লিখে ফেলে সে। পাশে চরিত্রের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা।

১। পথিক- গল্পের প্রধান চরিত্র। সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার অভাবে প্রেমিকার সাথে বিয়ে হয়নি। দীর্ঘদিন পর পুরনো প্রেমিকার সাথে যোগাযোগ। নায়লাকে পাওয়ার জন্য বেপরোয়া।
২। নায়লা- পরিবারের চাপাচাপিতে অন্য পুরুষের সাথে বিয়ে যা সে মেনে নিতে পারেনি। দীর্ঘদিন পর পুরনো প্রেমিকের সাথে যোগাযোগ। মানসিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। একদিকে পথিকের জন্য মমতা আর অন্যদিকে সমাজ।
৩। নায়লার স্বামী-(নামটা এখনো ঠিক করা হয়নি। সাজ্জাদ নামটা কেমন? মেজর সাজ্জাদ।)- সামরিক কর্মকর্তা। অত্যন্ত ভালো মানুষ। বুদ্ধিমান ও হৃদয়বান পুরুষ।

এইটুকু লেখার পর রাশেদ বড় বড় করে লিখল,

প্লটঃ পথিক ও নায়লার পরকীয়া প্রেম

কলমের পিছন দিকটা মুখে গুঁজে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ে রাশেদ। এখন গল্পে একটা ক্রাইসিস লাগবে। একটা সমস্যা তৈরি করতে হবে চরিত্রগুলোকে ঘিরে। একটা ক্লাইম্যাক্সে নিয়ে আসতে হবে সেগুলোকে। ক্রাইসিসটা কিভাবে তৈরি করা যায় ভাবছে। হঠাৎ করে মনে হলো খুব পুরনো একটা বিষয় নিয়ে আসলে লেখার পরিকল্পনা করছে সে। লিখতে বসার সময়কার প্রাথমিক উৎসাহ ঝিমিয়ে আসে এটা ভেবে। তারমানে ঘটনাগুলোকে বেশ ব্যতিক্রমী ধরনের হওয়া লাগবে। নতুন ধরনের কিছু।

আলসেমি জাগানো দুপুরের ভ্যাপসা গরম আর লেখার কাগজকলম ছাড়িয়ে কল্পনাকে আকাশে ডানা মেলতে দিলো রাশেদ। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ভাবছে সে। শুরুটা কেমন হতে পারে? কিছুদিন আগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ছোটগল্পগুলো সম্পর্কে একজনের একটা আর্টিকেল দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে সে পড়েছিলো। মানিক নাকি মনে করতেন ছোটগল্পগুলোর এক ধরনের ফরম্যাট হতে পারে এরকম যে, সেটা হবে কোন একটা মানুষের দশ থেকে পনেরো মিনিটের চিন্তার বর্ণনা। এই চিন্তার বর্ণনার মাঝে ফুটে উঠবে ঐ মানুষটাকে ঘিরে একটা ঘটনা। কিন্তু রাশেদ কোন ধরনের মানসিক পরিক্রমার কথা লিখতে চাচ্ছে না। সে চাচ্ছে এমনধরনের একটা গল্প লিখতে ব্যক্তিগতভাবে যে ধরনের লেখা সে নিজে পছন্দ করে। অর্থাৎ ছোটগল্প হলে তাতে থাকতে হবে অপ্রত্যাশিত কোন পরিসমাপ্তি। যাতে পাঠকের মনে একটা দাগ রেখে যেতে পারে গল্পটা।

পরকীয়া প্রেমের গল্প হলে সিনেমাতে দেখানো হয় সেটার ব্যর্থতা। থ্রিলার হলে অবধারিতভাবে চলে আসে খুনখারাবি। থ্রিলারের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়েও থ্রিলার লিখতে চাচ্ছে না সে। তার গল্প হবে বাস্তবকে ঘিরে। বাস্তবের চরিত্রগুলো থ্রিলারের চরিত্রগুলোর মতন এতো সহজে নিশ্চয়ই খুনখারাবিতে জড়িয়ে পড়ে না। লেখালেখির মধ্যে কিছুতেই ‘Tradition paralysis’-এর শিকার হবে না সে। সবাই যেটাকে অবক্ষয় বলে, সে সেটাকে অবক্ষয় বলবে না। সে আরও তলিয়ে দেখবে। আরো তলিয়ে পাঠককে দেখাবে।

নায়লা আর পথিকের মধ্যে সম্পর্কের কারণে তৈরি একটা ক্রাইসিস আর ক্লাইম্যাক্স নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে দুই চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো তার সে টেরও পেলো না। ঠিক তখনই শহরের অন্য কোন প্রান্তে তার গল্পের প্রধান চরিত্র বাস্তবের পথিক একটা খুনের পরিকল্পনা করছে। নিখুঁত পরিকল্পনা।


(অসম্পূর্ণ।। হয়তো চলবে)
পরকীয়া প্রেমের গল্প হলে সিনেমাতে দেখানো হয় সেটার ব্যর্থতা। থ্রিলার হলে অবধারিতভাবে চলে আসে খুনখারাবি। থ্রিলারের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়েও থ্রিলার লিখতে চাচ্ছে না সে। তার গল্প হবে বাস্তবকে ঘিরে। বাস্তবের চরিত্রগুলো থ্রিলারের চরিত্রগুলোর মতন এতো সহজে নিশ্চয়ই খুনখারাবিতে জড়িয়ে পড়ে না। লেখালেখির মধ্যে কিছুতেই ‘Tradition paralysis’-এর শিকার হবে না সে। সবাই যেটাকে অবক্ষয় বলে, সে সেটাকে অবক্ষয় বলবে না। সে আরও তলিয়ে দেখবে। আরো তলিয়ে পাঠককে দেখাবে।

নায়লা আর পথিকের মধ্যে সম্পর্কের কারণে তৈরি একটা ক্রাইসিস আর ক্লাইম্যাক্স নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে দুই চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো তার সে টেরও পেলো না। ঠিক তখনই শহরের অন্য কোন প্রান্তে তার গল্পের প্রধান চরিত্র বাস্তবের পথিক একটা খুনের পরিকল্পনা করছে। নিখুঁত পরিকল্পনা।

2 comments:

Affan Ferdaus said...

ভাই, আপনার গল্পটা চমৎকার হলেও অসম্পূর্ণ। এটা কি শেষ করেছেন? করলে বাকিটুকু কোথায়? জানতে খুব ইচ্ছে করছে। affan023@gmail.com

R O M E L said...

Couldn't finish... it was a failure... sobai ki sob pare?