Saturday, May 29, 2010

শহর মানেই গ্রামের গল্প...

বাসে জানালার ধারে বসলে মনে হয় সিনেমা দেখছি। বিশেষ ক’রে সন্ধ্যের পর জানালার ফ্রেমগুলো টিভিপর্দার মত লাগে। দিনের ব্যস্ততা আর ছুটোছুটির সাথে তখন যোগ হয় অবসাদ আর ভ্যাপসা অস্থিরতা। চারদিকে অন্যমনষ্ক মানুষের ভীড়। বাসের যাত্রীরা নিষ্প্রাণ চোখে বাইরে বা সামনে তাকিয়ে থাকে। যেন বেঁচে থাকাটা স্রেফ সহ্য করে নিয়েছে তারা। আর কিছু নয়। কারো কারো কাছে কি আমাকেও ঐরকম মনে হয়? কি জানি। সবাই ওভাবে গোমড়ামুখ হয়ে বসে কি ভাবে মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছা হয় আমার। জানার উপায় নেই। আমি তাই জানালার ফ্রেমে সিনেমা দেখতে মশগুল হই। নানারকম গাড়ির হর্ণ, চিৎকার আর কোলাহলের শব্দ ছাপিয়ে মনের মধ্যে প্রিয় কোন গান ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে বাজতে থাকে। কাজের জায়গা থেকে দিন শেষে বাড়ি ফিরতে প্রায় সোয়া এক ঘন্টা লেগে যায়। এলোমেলো নানান ভাবনায় আচ্ছন্ন থেকে বেশ কেটে যায় সময়টা।

ঢাকা শহরের প্রায় সব রুটের বাসে আমাকে চড়তে হয়। কোন বাস সার্ভিসের রুট কোথায়-কতদূর, এ বিষয়ে আমি মোটামুটি বিশেষজ্ঞ। ছোট একটা কোম্পানিতে কাজ করি। মালিকের অর্ডার-সাপ্লাইয়ের ব্যবসা। নানারকম স্যাম্পল নিয়ে ক্লায়েন্টদের কাছে প্রায়ই ছুটতে হয়। মার্কেট যাচাই করতে ঘুরতে হয় বিভিন্ন জায়গায়। প্রথম প্রথম দু’চার টাকা বাঁচাতে লোকাল মিনিবাসগুলোতে ভীড় ঠেলাঠেলি করে উঠতাম। কিন্তু ইদানিং ভীড়ের মধ্যে মানুষের ঘামের উটকো দুর্গন্ধটা আর সহ্য হয় না। তাই সিটিং সার্ভিসগুলোতে চেপে বসি। দু’চার টাকা বাঁচানোর তাড়া আর অনুভব করি না। তাছাড়া মাঝে মাঝে অল্পবয়সী সুন্দরি কোন মেয়ের পাশে বসারও সৌভাগ্য হয়। কল্পনাগুলো তখন পক্ষীরাজের পিঠে চেপে ছোটে। সেসময়গুলোতে মোবাইলে কোন কল আসলে বেশ ভারিক্কি চালে কথা বলি। আড়চোখে বারবার তাকাই। নিজের ছেলেমানুষিতে নিজেই আবার মনে মনে হাসি।

আমাদের কোম্পানিতে আমার মত আরো দু’জন আছে। একজন হল তমাল। আরেকজন বারী ভাই। তমাল আমার দু বছরের জুনিয়র; আমাদের বস্‌ অর্থাৎ রেজা ভাইয়ের মামাতো ভাই সে। বেশ বদমেজাজি ছেলে। বেশ সামলে কথা বলতে হয় তার সাথে। আর বারী ভাই সিনিয়র মানুষ। কাজেকর্মে যাচ্ছেতাই। ব্যাচেলর মানুষ। তাকে প্রায়ই আমরা তার বিয়ে নিয়ে খোচাই। উনি কিছু বলেন না। মুখ টিপে হাসেন। আর আছে অফিসের পিওন বাবুল। পাঁচজনের অফিস দু’টো ঘর নিয়ে। আর আছে কিচেন ও ছোট একটা টয়লেট। একটা ঘরে রেজা ভাই অফিসে আসলে বসেন। আরেক ঘরে আমরা তিনজন। বাবুল রাতে অফিসেই থাকে। রেজা ভাইয়ের ঘরটার এককোণে বিছানা করে ঘুমায়। রেজাভাই অফিসে খুব কম সময় থাকেন। তার নাকি আরও কি কি ব্যবসা আছে। খুব ছুটোছুটি নাকি করতে হয়। বেশিরভাগ সময় আমাদেরকে নানান ডিরেকশন দেয়া হয় মোবাইল ফোনে। অফিসে দু’টো কম্পিউটার আছে। রেজা ভাইয়েরটাতে ইন্টারনেট আছে। প্রায়ই বাইরে থেকে অফিসে ফিরে দেখি তমাল ওটাতে বসে চ্যাটিং করছে। বাইরে থেকে এসে এই দৃশ্য দেখে রাগ ওঠে। কিন্তু কিছু বলি না। করুক যার যা খুশি। বারী ভাইয়েরও কাজেকর্মে মন নেই। উনি বসে বসে খবরের কাগজে কি যেন পড়েন। মাঝে মাঝে তার ঠোঁটের কিনারায় মৃদু হাসির রেখা দেখা যায়। এই তো আজকেও তমাল বারী ভাইয়ের হাসি দেখে টিটকারি দিয়ে বলে উঠলো- “ভাই, আর কত পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন দেখবেন?” মুখের হাসিটা অল্প একটু প্রসারিত করে উনি বললেন- “পাত্রী চাই দেখি না তো। আরও কত মজার জিনিস আছে দেখার।“ তমাল আরও একধাপ নামে- “তাহলে কি গোপন রোগের চিকিৎসার অ্যাড্‌ দেখেন নাকি?” তমালের বেয়াদবি দেখে গা জ্বলে। কিছু বলি না। আলসেমি লাগে যেন। মনে হয়- কী লাভ! কুকুরের লেজ কি সোজা হয়?

বাসের জানালা দিয়ে লাল-নীল নিওনের আলো দেখতে দেখতে কি মনে হল। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে ইংরেজি হরফে একটা মেসেজ লিখলাম-“অনেকদিন খোঁজখবর নেই। ভুলে গেলেন না তো?” লিখে মুছে ফেললাম। নাহ, আপনি করে লিখব না। বয়সে বড় হলেও শেষবার তো তুমি তুমি করেই কথা হয়েছিল। আবার লিখলাম- “কেমন আছো? ভুলে গেলে নাকি?” আবার মুছলাম। ন্যাকামি করার জন্য নিজেকে ঝেড়ে দু’টো বকা দিলাম। মোবাইলটা আবার পকেটে ভরলাম। মেসেজ পাঠালাম না। মেয়েটাকে বেশি পাত্তা দেওয়া ঠিক হবে না।

শ্যাওড়াপাড়ায় একটা দুইরুমের বাসা ভাড়া করে আমি আর আমার বন্ধু মারুফ থাকি। ছয়তলায় বলে ভাড়া কিছুটা হাতের নাগালে। বাস থেকে নেমে হেঁটে অনেকটা ভিতরে যেতে হয়। তারপর ছয়তলার সিঁড়ি ভাঙ্গা। তালা খুলে বাসায় ঢুকি প্রতিদিন। মারুফ বেশ রাত করে ফেরে। একা থাকতে আমার ভালো লাগে। মারুফের সাথে থাকার সুবিধা হল ওর-ও একা থাকতে ভালো লাগে। ফলে দু’জনেই নিজের নিজের মত থাকি। ঝামেলা হয় না। মারুফ আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু যদিও নয়, তবু আমার মনে হয় ও আমাকে বেশ বুঝতে পারে।

আজকে বাসায় ফিরে দেখি মারুফ আমার আগেই এসে পড়েছে। তালা নেই। নক করতেই ও খুলে দিল। বললাম-কিরে আজকে এতো তাড়াতাড়ি? মারুফের সংক্ষিপ্ত জবাব- শরীরটা ভাল নেই। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করে জবাব পেলাম না। জানতাম পাবো না। তাই আর কিছু বললাম না। চোখে লালচে ভাব দেখে ভাবলাম জ্বর-টর হয়েছে মনে হয়। ঘরে গিয়ে কাপড় ছেড়ে গোসল করতে ঢুকলাম। বাথরুমে সিগারেটের গন্ধ। দম আটকে এলো। মারুফকে অনেক অনুরোধ করেছি বাথরুমে সিগারেট না টানতে। লাভ হয় না। বলে- সিগারেট ছাড়া নাকি তার বাথরুম ক্লিয়ার হয় না। আজব লাগে আমার। একসাথে থাকার স্বার্থে এটা আমাকে মেনে নিতে হয়।

(হয়তো চলবে)

No comments: