Saturday, July 4, 2009

নোটস্‌ ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড

এক
ঘরটা ছোট। বড়জোড় দশ ফুট বাই দশ ফুট। ছোট একটা জানালা আছে। গ্রীল দেয়া। ঘরের দরজাটাও ছোট। ক্লস্ট্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত একজন মানুষের জন্য ঘরটা একটা টর্চার সেল। ছোটখাট একটা দোজখ। মন-খারাপ করা চুনকাম-খসে যাওয়া দেয়াল দিয়ে ঘেরা কফিন.। তবু প্রতিটা দিন বেলা শেষে নিজের শ্রান্ত দেহটাকে টেনেহিঁচড়ে ঘরের কোণের সাড়ে পাঁচ ফুট বাই তিন ফুট চৌকিটাতে এনে ফেলে দিতে হয় মামুনকে। তার আগে সিলিং ফ্যানের সুইচটা অন করতে হয়। টিমটিমে বাতিটা জ্বালতে হয়। ঘড়ঘড় শব্দ করতে করতে সিলিং ফ্যানটা নিতান্ত অনিচ্ছায় ঘুরতে থাকে। বাতাস হয় না তেমন। প্রায়ই ভাবে সিলিং ফ্যানের ক্যাপাসিটর বদলাতে হবে। তাহলে নাকি বাতাস বাড়বে। আরও অনেক জরুরি কাজের মতন এটাও করা হয়ে ওঠে না।
চিত হয়ে সোজা হয়ে শুলে সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা চৌকিটাতে লম্বা শরীরটা আঁটে না। পা বেরিয়ে থাকে। পাশ ফিরলে ক্যাঁচকোঁচ করে শব্দ হয়। অনেকদিন না ধোয়ায় বালিশের ওয়াড়ে একটা বিশ্রি বাজে গন্ধ। বেডশীটটারও একই দশা। ময়লা জমে জমে তাতে আঠালো একটা ভাব।
সব কিছু সহ্য হয়। শুধু এই একটা ব্যাপারই সহ্য হতে চায় না। কিছুক্ষণ ঘরের মধ্যে থাকলেই মনে হয় ঘরটা ছোট হয়ে আসছে। ঘরের ছাদ দ্রুত নিচে নেমে আসছে। চারপাশে ধীরে ধীরে আলো কমে আসছে। নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য দরকারি বাতাস কমে যাচ্ছে দ্রুত। এখনই দমবন্ধ হয়ে যাবে যেন। হাসফাঁস লাগে। ভয় হতে থাকে আরেকটু পরই হয়তো ঘরটা কবর হয়ে যাবে। ফ্যানের দিকে তাকিয়ে নিজেকে বারবার অটোসাজেশন দিতে হয়- আমি চমৎকার নিঃশ্বাস নিতে পারছি। আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে না। শরীর খারাপ লাগছে না। ঘর ছোট হয়ে আসছে না। ছাদটা নিচে নেমে আসছে না। বিড়বিড় করে কথাগুলো বলতে বলতে নিজেকে ভীষণ রকম অসহায় লাগে মামুনের। ভীষণ রকম ক্লান্ত আর অবসন্ন লাগে। নিজেকে কীট-পতঙ্গ মনে হতে থাকে। মানুষ বলে আর মনে হয় না। ঘামে চটচটে হয়ে থাকা শরীর নিয়ে নিথর শুয়ে শুয়ে বিড়বিড় করে সে আপনমনে। এটা রোজকার একটা ব্যাপার।
মামুন জানে সে আস্তে আস্তে মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছে। যখন এক্কেবারে ঘরটাকে কবর মনে হতে শুরু করে সাইকোলজির ভাষায় যাকে বলে প্যানিক এটাক, তখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সে রাস্তায়। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটাহাঁটি করে, কোথাও বা থমকে দাঁড়ায়, মানুষের চলাচল দ্যাখে আর লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নেয়। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চায় যতটা পারে। খোলা কোন মাঠে বা নদীর পাড়ের ভেজা বাতাসের মাঝে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। সময়ে সময়ে প্রায়ই তার মনে হয় বেশিদিন সে বাঁচবে না এই শহরে। এইরকম সময়গুলোতে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে এই বেঁচে থাকার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে থাকে। কত অদ্ভুত আর আজব সব ভাবনা যে আসে মনে তার কোন সীমা পরিসীমা নেই। মাঝে মাঝে এটাও মনে হয় যে মৃত্যুর জন্য এভাবে অপেক্ষায় না থেকে কাজটা নিজে নিজে সেরে ফেলাই মনে হয় বেশি লজিক্যাল। তারমানে আত্মহত্যা, যেটা কিনা আবার মহাপাপ। ছাব্বিশ বছরের কোন যুবকের জন্যে এটা অস্বাভাবিক সেটা না বললেও চলে।
সেদিনও এরকম একটা দম-আটকে-আসা সন্ধ্যায় সুইসাইড করা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ফুটপাত ধরে হাঁটছিল। ফুটপাতের ধারে ইদানিং সস্তা ধরনের মিউজিক ভিডিও, গান ইত্যাদির সিডি, ডিভিডি আর নানারকম বই (ধর্মীয় কিতাব থেকে শুরু করে পর্ণোগ্রাফিক সাহিত্য) সাজিয়ে নিয়ে হকাররা বসে। পুরনো বইও পাওয়া যায়। অলসভাবে প্রথমে চটি ঘাটতে ঘাটতে পুরনো বইগুলোর দিকে এগোল সে। হঠাৎ চোখ পড়ল “মরণের আগে ও পরে” বইটার উপর। হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল বইটা। লেখকের নাম মাওঃ শাহ্‌ ওয়ালিউল্লাহ। মাওঃ মানে বোধহয় মাওলানা। পুরনো বই। সেকেন্ড-হ্যান্ড। মলাটের খানিকটা ছেঁড়া। মৃত্যুচিন্তা হচ্ছিল আর সস্তায় পাওয়া গেল বলেই মনে হয় বইটা কিনে ফেলল সে। দাম নিল চল্লিশ টাকা। বইয়ের পাতা উল্টপাল্টে দেখা গেলো বেশ কাব্যিক ভাষায় মানুষের জন্ম-মৃত্যু-পরিণতি-কবরের আজাব-হাশর-বেহেস্ত-দোজখ ইত্যাকার বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করা হয়েছে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট কবিতাও লেখা। বই পড়ার অভ্যাস একেবারেই নেই তার। তবে আত্মহত্যাপ্রবণ একজন মানুষ হিসাবে “মরণের আগে ও পরে” পড়া যেতে পারে। জানা দরকার কী আছে ওপারে মানে মৃত্যুর পরে। মাওঃ শাহ ওয়ালিউল্লাহ কী বলেছেন দেখা যাক।
“কী আছে ওপারে”-কথাটা মনে হতেই সে বুঝতে পারল ওপার ব্যাপারটা সে আসলে মন থেকে বিশ্বাস করে। মানে ইহকাল-পরকাল এই দুটো আলাদা জগতের সমান্তরাল অবস্থান আর তাদের বিভাজনে তার বিশ্বাস আছে। সেকেন্ড-হ্যান্ড “মরণের আগে ও পরে” বইটা হাতে নিয়ে ফুটপাতের ভীড়ে মিশে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জটিল সব দার্শনিক চিন্তা ভর করতে শুরু করল তার মাথায়। এই যে বেঁচে থাকা, দুঃখ-কষ্টের অনুভূতি, হতাশা- এই যে কোন কিছু ছোঁয়া, জিভে খাবারের স্বাদ, শরীরে ব্যথার অনুভূতি এগুলো মৃত্যুর পর থাকবে কিভাবে? দেহ আর ইন্দ্রিয় তো কবরের মাটিতে মিশে যাবে। তাহলে কবরের আজাবের অনুভূতি কিভাবে পাবে মানুষ? এরকম হাজারো চিন্তা ভর করে মামুনের মাথায়।
সন্ধ্যের এই সময়টায় মানুষ তাড়াহুড়া করে ঘরে ফেরে। অফিস থেকে, কাজ থেকে কিংবা অকাজ থেকে। কোথায় যেন ও পড়েছিল-“Home is the place where when you have to get back, they have to take you in.” কার কথা মনে নেই। সে নিজে তো উলটো ঘর থেকে পালায়। একটা দীর্ধশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে তার। মিশে যায় শহরের গরম ডিজেল আর পেট্রোল পোড়া বাতাসে।
বইটা এখনো পড়ে আছে তার নোংরা বালিশটার পাশে। পড়া হয়ে ওঠেনি। আসলে সেদিন কেনার সময় যেমন পড়ার আগ্রহ হয়েছিল, সেরকম আগ্রহও আর হয়নি।
মামুনের একটা মোবাইল ফোন আছে। সস্তা ধরনের। যে চাকরি সে করে তার সাথে মানানসই। খুব কমই ব্যবহৃত হয় যন্ত্রটা। আসলে ওর পরিচিত মানুষের গণ্ডি খুবই সীমিত। তবে একটা মেয়ের সাথে প্রায় রাতেই গল্প হয় ওর। এসএমএস-ও আদান-প্রদান চলে। তবে সেটার হারও খুব বেশি নয়। মেয়েটার নাম সিনথি। সিনথির সাথে সেই গল্প করার সময়টুকুতে মামুন সুইসাইডের কথা ভুলে যায়। সিনথি যদি সত্যি কথা বলে থাকে ওকে, তাহলে ধরে নিতে হবে মেয়েটা ওরই মত সুইসাইড নিয়ে ভাবছে অথচ সাহস পাচ্ছে না। মেয়েটার সাথে কথার খেলা খেলতে খেলতে ঘুমে যখন চোখ জড়িয়ে আসে তখন ফোন কেটে যায়। আর যেদিন এই কথার খেলা জমে না, দুজনেই বলার মতন কিছু খুঁজে পায় না, সেদিন ক্লস্ট্রোফোবিয়ায় পেয়ে বসে তাকে, সাফোকেশন শুরু হয়, রাত নির্ঘুম হয়ে যায়। ইনসমনিয়া বুকে চেপে বসে। টেবিলের ড্রয়ারে বেশ অনেকরকম ঘুমের অষুধ থাকে সব সময়। মিডাজোলাম থেকে শুরু করে ব্রোমাজিপাম-সব। সেই নির্ঘুম রাতগুলোতে ছ’সাতটা নানাপদের ট্যাবলেট গিলে ঘুমের অপেক্ষায় শুয়ে থাকে সে।
খাঠের ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ, টিকটিকিদের ডাকাডাকি, দূরে রাস্তায় রিকশার টুংটাং শব্দ করে চলে যাওয়া, নিঃস্তব্ধ রাতের ঝিঝি আওয়াজ- এসবের দিকে মনোযোগ দিয়ে সাফোকেশন থেকে বাঁচতে চায় সে কিংবা সিনথির কথা ভাবতে থাকে অথবা ছুটির দিনে বসুন্ধরা সিটি বা রাইফেলস স্কয়ার এর সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা মেয়েগুলোর শরীরের ভিতর আর বাইরেটা নিয়ে ভাবতে থাকে। শারীরিক উত্তেজনা দিয়ে দম আটকানো ভাবটা চাপা দিতে চায়। ওসব ভাবতে ভাবতে কোন কোন দিন ঘুম এসে যায়। কোন কোন দিন আসে না। স্লিপিং পিলের প্রভাবে হালকা ঝিম ধরা একটা অনুভূতি নিয়ে রাত পার হয় সেই নির্ঘুম রাতগুলোতে। বলা বাহুল্য ঠিক একই রকম একটা নতুন দিন আসে। সকালবেলার সূর্যোদয় নাকি অনেকের খুব ভালো লাগে। হয়তো তারা প্রতিদিন দেখতে পায় না বলে। মামুনের কাছে সূর্য ওঠা কোন আনন্দ বয়ে আনে না। আরেকটা ক্লান্তিকর চূড়ান্ত ডিপ্রেসিভ দিনের শুরুটা কোন বিশেষ আনন্দ বয়ে আনার কথা নয় কারো জন্যেই।
আজকেও অমন একটা নির্ঘুম রাত গেছে। গরমকালে তাড়াতাড়ি সকাল হয়। খুব তাড়াতাড়ি চারদিক উজ্জ্বল চোখ-ধাঁধানো আলোয় ভরে ওঠে। ছোট গ্রীল দেয়া জানালাটা দিয়ে আসা এক চিলতে রোদ্দুরেই ছোট ঘরটা ঝকঝকে আলোয় জ্বলজ্বল করে। মামুনের চোখে জ্বালা ধরায় ওই আলো। ছ’টা বাজে। অফিসে রওনা হবে সাড়ে আটটায়। দু’ঘন্টা সময় কাটাতে বালিশের পাশের “মরণের আগে ও পরে” হাতে তুলে নেয় সে। উর্দ্দু শব্দের মুহুর্মুহু ব্যবহার বিরক্তি ধরিয়ে দিল পাঁচ মিনিটেই।
(to be continued)